কুমিল্লায় ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৫ সালে। এরপর নগরে যে কয়েকটি ‘কিশোর গ্যাং’ আলোচনায় এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘স্কোয়াড’। আধিপত্য বিস্তার, মারামারি, রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হত্যার মতো ঘটনায় গত কয়েক বছরে এ গ্রুপের নাম বারবার আলোচনায় এসেছে।
এই ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনকে গত বুধবার বিকেলে একটি মিছিলে দেখা গেছে। মিছিলটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিন। তাঁর ঠিক পেছনে ছিলেন রতন। কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে ধর্মসাগর পাড় সড়কে ওই মিছিল হয়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও গতকাল শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে মহসিনকে সামনে থেকে মিছিলের নেতৃত্ব দিতে এবং তাঁর পেছনের সারিতে রতনকে হাঁটতে দেখা যায়। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলার সময় একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ‘গ্যাং লিডারের’ উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানতে চাইলে ছাত্রদল নেতা মো. মহসিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি অনুসারীদের নিয়ে গিয়েছিলেন। মিছিলে অনেক মানুষ ছিল। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কীভাবে সেখানে এল, তিনি জানেন না। তিনি বলেন, ‘এত মানুষের ভিড়ে কে সন্ত্রাসী, কে কিশোর গ্যাং লিডার বা কে মাদক ব্যবসায়ী—তা ব্যক্তিগতভাবে চেনা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।’
কিশোর গ্যাং নেতাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে মহসিন বলেন, ‘ওই কিশোর গ্যাং লিডারের সঙ্গে আমার কোনো দিন কোনো ধরনের ওঠাবসা, চা খাওয়া কিংবা কোনো ধরনের শেল্টার দেওয়ার প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। এটি একটি কেন্দ্রীয় প্রোগ্রাম ছিল; কোনো ব্যক্তিগত কর্মসূচি নয়।’
ছাত্রদল-বিএনপিতে কিশোর গ্যাংয়ের অনুপ্রবেশ ও পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ে মহসিন বলেন, এটা ঠিক কিশোর গ্যাং বিএনপিতে ঢোকার চেষ্টা করছে। তবে ছাত্রদল কখনো তাদের (কিশোর গ্যাং) প্রশ্রয় দেয়নি। তাদের অজান্তেই কখনো কখনো এমন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। তাদের চিহ্নিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের।
যোগাযোগ করলে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নাহিদুজ্জামান রানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা সব সময় কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী আন্দোলন করছেন। ভিডিওটি নজরে আসার পরই তিনি মহসিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। মহসিন তাঁকে জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে তিনি জানতেন না। এরপরও তাঁরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। তাঁর সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো সম্পৃক্ততা থাকলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘রতন গ্রুপের’ বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
রতন গ্রুপের সদস্যরা কুমিল্লা নগরের ধর্মসাগর পাড়, রানীর কুঠি, রানীর দিঘি, তালপুকুর পাড় ও ঝাউতলা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে সংঘর্ষেও জড়িয়েছে। এতে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া মাদকসেবন ও কেনাবেচা, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আছে।
রতন গ্রুপের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়েছে র্যাব, পুলিশ ও সেনাবাহিনী। গ্রুপের প্রধান রতন, অন্যতম সদস্য মাইনুদ্দিনসহ কয়েকজন বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তারও হয়েছেন। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল রাতে র্যাব ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে রতনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে বেরিয়ে তিনি এলাকায় আছেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কুমিল্লার অন্যতম শীর্ষ কিশোর গ্যাং লিডার রতন এখন জামিনে আছেন বলে জেনেছি। তাঁকে ধরতে এখন পর্যন্ত কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে তিনি পালিয়ে গেছেন।’