প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে ১১৪টিতেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছে ম্যানচেস্টার সিটি। গতকাল 'দ্য অ্যাথলেটিক' এই বড় খবরটি প্রকাশ করে। দুই বছর আগে যখন এই মামলার শুনানি শুরু হয়, তখন বিবিসি এটিকে খেলাধুলার ইতিহাসে 'শতাব্দীর আলোচিত বিচার' হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। দ্য অ্যাথলেটিকের নিজস্ব সূত্রের বরাতে বিবিসিও রায়ের খবরটি নিশ্চিত করেছে।
যদিও ক্লাবটির বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হয়েছে, তবে এখনো কোনো শাস্তির সিদ্ধান্ত আসেনি। স্বাধীন কমিশনের কাছে এখন এই বিষয়টি ঠিক করতে হবে যে, আর্থিক নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে সিটিকে কী ধরনের শাস্তি দেওয়া হবে। সিটি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, ফলে শাস্তি চূড়ান্ত হতে আরও সময় লাগতে পারে। প্রশ্ন উঠছে, সবচেয়ে কঠোর শাস্তিগুলোর কোনটি পেতে পারে ক্লাবটি? এবং এতদিনে জেতা শিরোপাগুলোর কী হবে?
সিটির বিরুদ্ধে ওঠা ১১৫টি অভিযোগকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
১. ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত সঠিক আর্থিক তথ্য দিতে ব্যর্থ হওয়ার ৫৪টি অভিযোগ।
২. একই সময়ে খেলোয়াড় ও কোচদের পারিশ্রমিক সংক্রান্ত সঠিক তথ্য না দেওয়ার ১৪টি অভিযোগ।
৩. ২০১৩-১৪ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত উয়েফার বিভিন্ন নিয়ম, যার মধ্যে ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) অন্তর্ভুক্ত, মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ার ৫টি অভিযোগ।
৪. ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগের পিএসআর (প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি) নিয়ম ভঙ্গ করার ৭টি অভিযোগ।
৫. ডিসেম্বর ২০১৮ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত প্রিমিয়ার লিগের তদন্তে সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হওয়ার ৩৫টি অভিযোগ।
অভিযোগের বেশিরভাগ সময়কাল ২০০৯-১০ থেকে ২০১৭-১৮ মৌসুম পর্যন্ত। এই সময়ে ক্লাবটি তিনটি প্রিমিয়ার লিগ, তিনটি লিগ কাপ এবং দুটি এফএ কাপ জিতেছে। অর্থাৎ, অভিযোগের সময়কালে সিটির শোকেসে মোট আটটি বড় ঘরোয়া ট্রফি উঠে এসেছে। ২০১১-১২ মৌসুমে প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ জেতে সিটি। এরপর ২০১৩-১৪ মৌসুমে শিরোপা আসে। পেপ গার্দিওলার অধীনে ২০১৭-১৮ মৌসুমে তারা আবার লিগ জেতে। লিগ কাপগুলো জিতেছে ২০১৩-১৪, ২০১৫-১৬ ও ২০১৭-১৮ মৌসুমে, আর এফএ কাপ জিতেছে ২০১০-১১ ও ২০১৭-১৮ মৌসুমে।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এসব শিরোপা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হচ্ছে না। তবে সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে অতীতের অর্জন থেকে শিরোপা বা অন্য ট্রফি কেড়ে নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। স্বাধীন কমিশনের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত অপেক্ষাতেই থাকতে হবে। কারণ, শাস্তি ঘোষণার সময়ই জানা যাবে কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
সিটির জন্য সবচেয়ে আলোচিত শাস্তিগুলোর একটি হতে পারে পয়েন্ট কাটা। সেটি বর্তমান মৌসুমে কিংবা ভবিষ্যৎ কোনো মৌসুমে কার্যকর হতে পারে। কত পয়েন্ট কাটা হবে এবং কখন কাটা হবে, তা নির্ধারণ করবে কমিশন। অতীতে আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের ঘটনায় এভারটন ও নটিংহাম ফরেস্টের পয়েন্ট কাটা হয়েছিল। তবে সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিমাণ ও ধরন অনেক বড় হওয়ায় ওই ঘটনাগুলো থেকে সিটির শাস্তি কতটা হতে পারে, তা সরাসরি বোঝার সুযোগ নেই।
সবচেয়ে কঠোর শাস্তি হতে পারে প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমন। সে ক্ষেত্রে সিটিকে শীর্ষ লিগের সদস্যপদ হারিয়ে নিচের বিভাগে (চ্যাম্পিয়নশিপ) যেতে হবে। অর্থাৎ অবনমন ঘটতে পারে পয়েন্ট কেটে নয়, সরাসরি বহিষ্কারের মাধ্যমেও। তবে এটি এখনো সম্ভাব্য শাস্তির তালিকার একটি মাত্র বিকল্প।
সিটির ওপর বড় অঙ্কের জরিমানাও আরোপ করা হতে পারে। এ ছাড়া খেলোয়াড়দের নিবন্ধন বা দলবদলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচে অংশ নেওয়া স্থগিত করাসহ কিছু শাস্তির সুযোগ রয়েছে।
সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর শুধু ক্লাবটির নিজেদের অর্জন নিয়েই প্রশ্ন উঠবে না, ওই সময়ের প্রতিযোগিতাগুলোর অন্য ক্লাবগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। সিটির বিরুদ্ধে এমন শাস্তি হলে কোনো ক্লাব যদি দাবি করে যে তাদের লিগ অবস্থান, পুরস্কারের অর্থ বা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়ার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেই দাবিও আলাদাভাবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের দাবির জন্যও পৃথক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে।
তবে এখন পর্যন্ত এসবের কিছুই চূড়ান্ত নয়। ১১৪টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর পরবর্তী ধাপ শাস্তি নির্ধারণ। এরপর সিটির আপিলের সুযোগও থাকবে। তাই সিটির কোনো শিরোপা বাতিল হবে কি না, কিংবা ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগ থেকে অবনমিত হবে কি না, তা জানতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। তবে কতটা সময়, তা আপাতত অজানা।