ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা ও ধারাবাহিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গীয় খ্রিষ্টীয় পরিষেবা (বিসিপি) নামক সংগঠনের দাবি, সম্প্রতি উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুর ও পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরিতে বসতবাড়ির ভেতরে প্রতিষ্ঠিত গির্জায় (হাউস চার্চ) হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মীরা হামলা চালিয়েছেন। এ ছাড়া অভিযোগ পেয়েও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

বিসিপির প্রতিষ্ঠাতা ও রাজ্য সম্পাদক হেরোদ মল্লিক জানান, গত তিন মাসে খ্রিষ্টানদের ওপর অন্তত ২৬টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিকার চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী, শুভেন্দু অধিকারী এবং সংখ্যালঘু দপ্তরের মন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে বিসিপি। স্মারকলিপিতে জানানো হয়, এসব ঘটনায় মোট ১১টি এফআইআর নথিভুক্ত হয়েছে। ভয়ভীতি দেখানোর কারণে আরও বেশ কয়েকটি হামলার অভিযোগ দায়ের করা সম্ভব হয়নি। উপাসনালয়ে ভাঙচুর, যাজক ও উপাসকদের হেনস্তা এবং ধর্মীয় সভায় গোলমাল সৃষ্টির মতো ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত।

খেজুরিতে যাজককে মারধর

গত ২০ জানুয়ারি রোববার দুপুরে পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরি থানার দেখালি জলপাই এলাকায় ‘দেখালি চার্চ অ্যান্ড মিশন’-এ হামলার ঘটনা ঘটে। সেখানে যাজক চিন্তামণি মিদ্দের পরিচালনায় প্রার্থনাসভা চলছিল। বিসিপির অভিযোগ, নিজেদের বজরং দলের সদস্য পরিচয় দিয়ে প্রায় ৫০ জন বহিরাগত জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়েন। তাঁরা বিনা প্ররোচনায় যাজক ও উপাসকদের ওপর হামলা চালান। উপাসকদের কুরুচিপূর্ণ গালাগাল ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি গির্জার কার্যক্রম বন্ধ করে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় হামলাকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামলাতে তাদের হিমশিম খেতে হয়। পরে বিসিপির সহায়তায় থানায় অভিযোগ দায়ের করেন ভুক্তভোগীরা।

ব্যারাকপুরে নারী উপাসকদের হেনস্তা

খেজুরির ঘটনার আগে গত শনিবার দুপুরে উত্তর ২৪ পরগনার ব্যারাকপুরেও হামলার ঘটনা ঘটে। মোহনপুর থানার বিল্লা ডিপো এলাকায় পূজা সাত্যকী নামের এক বাসিন্দার বাড়িতে প্রার্থনাসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বেলা ২টার দিকে ৫০ থেকে ৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল সেখানে ঢুকে পড়ে। তারা সবাই মদ্যপ অবস্থায় ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় বাসিন্দা সঞ্জিত সর্দার জানান, হামলাকারীরা লোহার রড নিয়ে উপাসকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা উপাসকদের মারধর করে, বাইবেলসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ ছিঁড়ে ফেলে এবং বাড়িঘর তছনছ করে।

এ ঘটনায় পূজা সাত্যকী, অর্পিতা সর্দার ও কুমা জানা নামের তিন নারী গুরুতর জখম হন। হামলাকারীরা ওই তিন নারীকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিকটবর্তী থানায় নিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। খবর পেয়ে বিসিপির আইনজীবী আদিত্য তিওয়ারি ও সমরজিৎ দে থানায় যান। পুলিশ জানায়, ওই নারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে বজরং দলের পরিচয় দেওয়া উন্মত্ত জনতা থানা ঘিরে ফেলে। তাদের গালাগাল ও তাণ্ডবে থানা চত্বরে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ ওই নারীদের নিরাপদে বের করে আনে।

পরপর এসব হামলার ঘটনায় রাজ্যের সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়েছে। রাজ্যে বিপুলসংখ্যক খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী ও গির্জা রয়েছে। তবে নিকট অতীতে এ ধরনের বৈষম্যমূলক আক্রমণের ঘটনা দেখা যায়নি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সমাজতাত্ত্বিকেরা। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা ও সুবিচারের আশ্বাস দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে।