২০ সেপ্টেম্বর রাতে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। বর্তমান সরকারের আমলে এটি দ্বিতীয়বারের মতো মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা। দেশে যখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে, ঠিক সেই সময়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
এমন এক মুহূর্তে জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছে যখন সরকার বেশ কিছু বড় ব্যয়ের অঙ্গীকার করেছে এবং সেই সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করেছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে জ্বালানির উচ্চমূল্য যুক্ত হলে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় ক্ষেত্রেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। এই দুইয়ের সমন্বয়ে আগামী মাসগুলোতে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সাধারণ ভোক্তার জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
সরকার কেন এই সিদ্ধান্ত নিল, তা কয়েকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। জ্বালানি খাতের সমস্যা উত্তরণে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং করছাড়সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মতো ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া বিপিসি ও পিডিবির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে লোকসানি অবস্থায় রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান কাটিয়ে উঠতে না পারলে বিদেশ থেকে ঋণ পাওয়া বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে। সরকার বলছে, প্রতি লিটার জ্বালানি তেলে ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধির ফলে ২০ টাকা লোকসান কমলেও বড় অঙ্কের লোকসান রয়ে যাবে।
তবে বিপিসির দেওয়া লোকসানের হিসাব কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জ্বালানি খাতের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু ত্রুটি থাকায় এই প্রক্রিয়ায় সংশোধন ও পরিমার্জন প্রয়োজন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অতি মুনাফা না করে আবার অতিরিক্ত লোকসানি অবস্থাতেও না পড়ে, সেই কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হওয়া উচিত। কিন্তু করপোরেট হওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে এই দর্শন মানা হয়নি। ফলে ভোক্তার জন্য মূল্য কমানোর সুযোগ থাকলেও তা করা হয়নি, বরং মুনাফা করা হয়েছে। এখন লোকসানের দায় পুনরায় ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে নিজেদের অদক্ষতা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতাকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।
তাই বিপিসির লাভ-লোকসানের খতিয়ান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বচ্ছভাবে নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এতে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে কোন পর্যায়ে রয়েছে তা বোঝা যাবে এবং ভবিষ্যতের আয়-ব্যয় ও মূল্য নির্ধারণের একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তি তৈরি হবে।
জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের বর্তমান প্রক্রিয়াটি বিইআরসি কর্তৃক আগে জারি করা প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত। আগে বাজার সমন্বয় করে দুই মাস অন্তর মূল্য পুনর্নির্ধারণ করার কথা ছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের পর তা স্থগিত করা হয়। ফলে প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে হঠাৎ দাম বাড়ালে ভোক্তার ওপর চাপ একবারে পড়ে। তাই আগের প্রক্রিয়ায় ফিরে যাওয়া এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার জন্য গণশুনানির ব্যবস্থা করা দরকার।
ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে সরকার আমদানি পর্যায়ে উচ্চ হারে আদায় করা শুল্ক ও করের পরিমাণ কমাতে পারত। প্রতি লিটারে প্রায় ৩৪ থেকে ৩৮ টাকা শুল্ক আদায় করা হয়। কিন্তু রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার সম্ভবত এই সমন্বয় করতে আগ্রহী নয়। একদিকে ভর্তুকি কমছে এবং অন্যদিকে শুল্ক-কর অপরিবর্তিত থাকছে, ফলে ভোক্তার ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এই মূল্যবৃদ্ধি কি আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনার অংশ নাকি সরকারি ব্যয় সমন্বয়ের চেষ্টা? আইএমএফ জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ে হঠাৎ উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। সরকারি খাতে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য খাতে ব্যয় সংকোচন ও সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সরকারের প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে উদ্বৃত্ত ও শূন্য পদ পর্যালোচনা, অপ্রয়োজনীয় বিভাগ একীভূত করা, নিয়োগ বন্ধ রাখা এবং ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর জন্য দ্রুত একটি উৎপাদনশীলতা কমিশন গঠন করা যেতে পারে।
নতুন বেতন স্কেলের প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রায় ৩৭ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা, যেখানে বাজেটে বরাদ্দ মাত্র ৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যাংকঋণ, বন্ড বা জ্বালানির দাম বাড়িয়ে সাশ্রয় করা অর্থ থেকে জোগান দেওয়া হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপে ফেলা অত্যন্ত বৈষম্যমূলক হবে।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য অর্থ সংস্থানের কথা বলা হলেও বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ফ্যামিলি কার্ডের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ও কৃষক কার্ডের জন্য ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও গ্র্যাচুইটির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে যে ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, তা এই খাতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্বালানি ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ বা বাজারভিত্তিক মূল্যে যাওয়ার কথা সমর্থন করলেও তা যেন সরকারের সামগ্রিক ব্যয় সংকোচনের অংশ হয়, বর্ধিত ব্যয় মেটানোর উপায় হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত ব্যয় সংকোচনের কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত যেন কেবল জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং অন্য খাতের বাড়তি ব্যয় বা অব্যবস্থাপনা মেটানোর উপায় না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
— ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম, সভাপতি, নলেজ হাব ইনস্টিটিউট। (মতামত লেখকের নিজস্ব)