দেশে প্রায় এক দশক ধরে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির পর টানা দুই বছরে তা কমেছে। একই সময়ে বড় ইলিশের সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় দাম বেড়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে মুক্তকণ্ঠের সঙ্গে বিশেষ কথা বলেছেন বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব। সাক্ষাৎকারটি পরিচালনা করেছেন পার্থ শঙ্কর সাহা।
২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টন ছিল, যা দুই বছরের মধ্যে প্রায় ৫ লাখ টনে নেমে এসেছে। এটি কি সাময়িক ওঠানামা নাকি ইলিশের মজুতে বড় ধরনের সংকটের সতর্কসংকেত—এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আব্দুল ওহাব জানান, ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন উৎপাদনের মাধ্যমে উল্লম্ফন শুরু হয়েছিল। এরপর প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন ১০ থেকে ২০ হাজার টন করে বাড়ছিল। তিনি বলেন, "মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল ২০১৮ সালে দেশের নদ-নদী ও সাগরে মাছের সর্বোচ্চ টেকসই উৎপাদন নিয়ে জরিপ করেছিল। তাতে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম, বাংলাদেশ প্রতিবছর ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করলে সেটি টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে। তবে কিছুটা রক্ষণশীল হিসাব করে আমরা বলেছিলাম, উৎপাদন কমবেশি সাড়ে ৫ লাখ টনের মধ্যে থাকবে; কিন্তু এখন উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে।"
ইলিশের দাম বৃদ্ধি এবং আকার ছোট হওয়ার তাৎপর্য আলাদা উল্লেখ করে তিনি ব্যাখ্যা করেন, "ইলিশের দাম বেড়ে যাওয়া এবং মাছের আকার ছোট হয়ে আসা—দুটির তাৎপর্য আলাদা। মূল্যবৃদ্ধির অর্থ সরবরাহ কমছে। আর আকার ছোট হওয়ার অর্থ ইলিশের সংখ্যা ও মজুত নিম্নমুখী হচ্ছে।"
একসময় বাংলাদেশকে ইলিশ বা নদীর মাছ ক্ষেত্রে বিশ্বের রোল মডেল হিসেবে গণ্য করা হতো, কারণ তখন ইলিশের সংখ্যা ও আকার উভয়ই বৃদ্ধি পেয়েছিল। অধ্যাপক আব্দুল ওহাব বর্তমান সমস্যাটিকে সাময়িক মনে করলেও দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, "এখনকার সমস্যাটি সাময়িক বলেই আমি বিশ্বাস করি। আমরা যদি ভুলগুলো শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারি, তাহলে ইলিশ আবার ফিরে আসবে।"
বাংলাদেশে ছোট ইলিশ ও জাটকা ধরার প্রচলন নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "বাংলাদেশে যেভাবে ছোট ইলিশ ও জাটকা ধরা হয়, কার্যকর মৎস্য ব্যবস্থাপনা আছে—এমন কোনো দেশে তা হওয়ার কথা নয়।"
অতিরিক্ত আহরণ, বেহুন্দি ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল, নদীদূষণ এবং ডুবোচর ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অধ্যাপক আব্দুল ওহাবের মতে, সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচার জাটকা নিধন। তিনি বলেন, "আমরা ইলিশের ওপর অবিচার করেছি তার ব্যবস্থাপনায়, তাই ইলিশ দ্রুতই প্রাকৃতিকভাবে তার প্রতিশোধ নিয়েছে। এ অবস্থার পেছনে বিজ্ঞানীরা যেসব কারণের কথা বলছেন, সব কটিরই কমবেশি প্রভাব আছে। তবে আমার বিবেচনায় সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচার জাটকা নিধন।"
মা ইলিশ রক্ষার জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করা হলেও ব্যবস্থাপনায় জনসম্পৃক্ততার অভাব রয়েছে। গত দুই বছরে এই কর্মসূচিতে শিথিলতা লক্ষ্য করা গেছে। নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধ ও সূক্ষ্ম ফাঁসের জালের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে, যা ইলিশের পাশাপাশি অন্য মাছ, চিংড়ি ও জলজ প্রাণীর পোনার বেঁচে থাকাকেও বাধাগ্রস্ত করছে। উপকূলের কাঠের নৌকাগুলোতে ট্রলিংয়ের ব্যবস্থা বাড়ায় জাটকা সাগরে নামার সময় বিপুল পরিমাণে মাছ ধরা হচ্ছে।
মেঘনা, তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন নদী ও মোহনায় পলি জমে ডুবোচর তৈরি হওয়ায় পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমেছে। এটি কি ইলিশকে অন্য দেশের নদী বা গভীর সমুদ্রে চলে যেতে বাধ্য করছে? এই প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক আব্দুল ওহাব জানান, "ডুবোচর ও পানির প্রবাহ কমে যাওয়া ইলিশের কতটা ক্ষতি করছে, সে বিষয়ে এখনো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। এটি আপাতত একটি অনুমান। ইলিশ বাংলাদেশের নদীতে না ঢুকে অন্য দেশের নদীতে চলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণও নেই। যেসব নদী এখনো ইলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোতে ডুবোচরের কারণে মাছের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। নদী খনন কিংবা নদীর তলদেশ গভীর করার আগে এর সম্ভাব্য ফলাফল ও স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পানি ও নদীবিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গবেষণা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জাহাজ চলাচলের প্রভাবে মা ইলিশের আগমন, প্রজনন এবং পোনার বেড়ে ওঠা ব্যাহত হয় বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তবে এ মুহূর্তে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো গবেষণা তথ্যের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, "শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জাহাজ চলাচলের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রভাবে মা ইলিশের আগমন, প্রজনন এবং পোনার বেড়ে ওঠা ব্যাহত হয় বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে এ মুহূর্তে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মতো গবেষণা তথ্য আমার হাতে নেই। শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা বন্দর সরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। দেশের উন্নয়নে এগুলো প্রয়োজন। তাই সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের গরম পানি যেন সরাসরি নদীতে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। কয়লা বা শিল্পবর্জ্য ক্ষতিকর হলে কার্যকর বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা থাকতে হবে। একটি খাতের কারণে আরেকটি খাত যেন বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়ে, সেদিকে নজর দিতে হবে।"
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, "জলবায়ু পরিবর্তন দেশের মাছ, বিশেষ করে ইলিশের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তবে এর প্রভাব এখনই তীব্র সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করি না। পানির তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলে মাছ স্বাভাবিকভাবেই নিজের জন্য অনুকূল জায়গা খুঁজবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় বদলে যেতে পারে। মাছের প্রজননক্ষম হওয়ার সময় এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে। ডিমের পরিমাণ ও ডিম থেকে পোনা বেঁচে থাকার হারও কমতে পারে।"
মা ইলিশ রক্ষার জন্য অক্টোবরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ঠিক আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "মা ইলিশ রক্ষার জন্য অক্টোবরে যে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটি এখনো ঠিক আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময়টা কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা গবেষণা করে দেখা উচিত। মার্চ ও এপ্রিলে জাটকা ধরার নিষেধাজ্ঞা শুধু অভয়াশ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক নয়। ইলিশ বিচরণ করে—এমন সব নদ-নদীতে এই দুই মাস জাটকা আহরণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে।"
উৎপাদন কেন কমছে এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কোথায়—এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আব্দুল ওহাব জানান, অতীতে ২২ দিন মা ইলিশ রক্ষা, ৮ মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, সাড়ে ৬ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করা এবং বন্ধের সময়ে জেলেদের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে উৎপাদন বেড়েছিল। তবে বর্তমানে বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক তিন ক্ষেত্রেই দুর্বলতা রয়েছে। ২০০৫ সালে পাঁচটি অভয়াশ্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ২০১৮ সালে হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জে আরও একটি ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ অভয়াশ্রম যোগ করা হয়। ওই অভয়াশ্রমে সুরক্ষা জোরদার হওয়ার পর ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। কিন্তু নদীর গতিপথ বদলে যাওয়ায় অভয়াশ্রমগুলোর সীমানা ও আয়তন নতুন করে মূল্যায়ন করা দরকার। আন্ধারমানিক নদে পোনা আসা বন্ধ হওয়ার পেছনে রামনাবাদ চ্যানেল ও আশপাশে বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পকারখানার চাপ ও শিল্পবর্জ্যের প্রভাব রয়েছে। পদ্মার মোহনায় মাত্র ২০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম করা হয়েছিল, কিন্তু এখন প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ইলিশের পোনা দেখা যায়। তাই অভয়াশ্রমগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন জরুরি।
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি নিয়ে তিনি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন না। তিনি বলেন, "এটিকে ইলিশ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ভারত থেকে ইলিশ আসাকে আমি নেতিবাচকভাবে দেখি না। আমাদের অতিরিক্ত উৎপাদন হলে এখান থেকেও ভারতে যাবে। তবে দেশে রুই, কাতলা, পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মতো মাছের যথেষ্ট উৎপাদন আছে। ইলিশ এখন স্যামনের মতো দামি মাছে পরিণত হয়েছে। এটি প্রতিদিন খাওয়ার মাছ নয়। তাই ইলিশের সামান্য ঘাটতি দেখা দিলেই ভারত বা মিয়ানমার থেকে আমদানির জন্য ঝাঁপিয়ে না পড়ে দেশি অন্য মাছের ওপর নির্ভর করা উচিত।"
ইলিশ রক্ষায় তিনি তিনটি প্রধান পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন: "প্রথমত, মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, জেলে পরিবারকে শুধু নিষেধাজ্ঞার সময় চাল দিলে হবে না, তাঁদের পূর্ণাঙ্গভাবে স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, মৎস্যসমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিন একই জায়গায় না রেখে নিয়মিত বদলির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।"
উৎপাদন পুনরুদ্ধার, দাম সহনীয় রাখা এবং জেলেদের জীবিকা রক্ষা—এই তিন লক্ষ্য অর্জনে সরকারের করণীয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এসব পদক্ষেপ ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে ইলিশ আবার ফিরে আসবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ, এই বাংলা ইলিশের বড়ই পছন্দের।"