পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরসহ সাতটি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে তীব্র জনবল সংকটে কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জেলায় মোট ৮৭টি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৫ জন। অর্থাৎ মোট পদের প্রায় ৭২ শতাংশ বা ৬২টি পদই বর্তমানে শূন্য। মাত্র ২৮ শতাংশ জনবল দিয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে।
জনবল সংকটের কারণে দাপ্তরিক কাজ এবং প্রাণীর চিকিৎসাসেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে খামারিরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন, যা তাদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিরোজপুর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে সাতটি পদের মধ্যে পাঁচজন কর্মচারী ও দুজন কর্মকর্তার পদ শূন্য; মাত্র তিনজন দিয়ে চলছে কার্যক্রম। পিরোজপুর সদর উপজেলা দপ্তরে ১১টি পদের মধ্যে নয়টি শূন্য, মাত্র দুজন কর্মরত। জিয়ানগর উপজেলা দপ্তরে আটটি পদের সবকটিই শূন্য, এখানে মাত্র তিনজন কর্মরত। নাজিরপুর উপজেলায় ছয়জন কর্মরত থাকলেও পাঁচটি পদ শূন্য। মঠবাড়িয়া উপজেলা দপ্তরে আটটি পদ শূন্য এবং মাত্র তিনজন কর্মরত। ভান্ডারিয়া উপজেলায় ১১টি পদের মধ্যে নয়টি শূন্য, মাত্র দুজন কর্মরত। কাউখালী ও নেছারাবাদ উপজেলা দপ্তরে আটটি করে পদ শূন্য এবং উভয় স্থানেই মাত্র তিনজন করে জনবল কর্মরত রয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ৭৪২টি গাভির খামার, ২১৬টি হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার, ৩৩২টি ছাগলের খামার, ২৭টি মহিষের খামার, ৯৯১টি লেয়ার মুরগির খামার, ৩১২টি ব্রয়লার মুরগির খামার, ১৭২টি সোনালি মুরগির খামার, ১৩৪টি হাঁসের খামার এবং ৩৬টি কবুতরের খামার রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলায় ১ দশমিক ৬১ লাখ মেট্রিক টন দুধ, ১ দশমিক ২৫ লাখ মেট্রিক টন মাংস এবং ১৬ দশমিক ৮৭ লাখ ডিম উৎপাদন হয়েছে।
সেবার অভাব নিয়ে পিরোজপুর শহরের মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা মাহাবুব হোসেন বলেন, "প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে সাধারণ মানুষ এসে নিয়মিত চিকিৎসক পাচ্ছেন না। এ কারণে আমরা সেবা পাচ্ছি না। এর মূল কারণ হচ্ছে, এই হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক নেই। জানতে পেরেছি, চিকিৎসকের পদ শূন্য। আমরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত মেধাবী চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে হাসপাতালের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হোক।"
জিয়ানগর উপজেলার ইন্দুরকানী গ্রামের কলেজশিক্ষার্থী মো. সিহাব হাওলাদার জানান, তার পোষা বিড়াল অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আনলেও মাত্র একজন ডাক্তার থাকায় এবং তিনি অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, "এখানে খুবই দুর্দশা। এই ভোগান্তি আমরা আর চাই না। আমাদের এলাকায় অনেক পশুপাখি রয়েছে। তাই আমাদের দাবি, হাসপাতালের শূন্য পদগুলো পূরণ করা হোক এবং আমরা যেন ভালো সেবা পেতে পারি।"
জিয়ানগর প্রেসক্লাবের সদস্য মো. আল আমিন বলেন, "আমরা যতটুকু জানি, এই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস জনশূন্য বললেই চলে। কারণ, এখানে অধিকাংশ জনবলই নেই। ১০-১১ জনের পরিবর্তে মাত্র দুই-তিনজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে চলছে এখানকার কার্যক্রম, যা অপ্রতুল। আমাদের এলাকার মানুষ প্রচুর পরিমাণে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালনে ঝুঁকছে। সে ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত জনবল থাকলে সাধারণ কৃষকদের জন্য সুবিধা হতো। সরকারের কাছে আবেদন জানাই, এখানে যেন পর্যাপ্ত জনবল দেওয়া হয়। আমরা দেখতে পাই, এই দপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের কার্যক্রম ভারপ্রাপ্তদের দিয়ে চলছে। এই ভারমুক্ত করে জনবল বৃদ্ধি করলে এলাকাবাসীর জন্য ভালো হবে। মাত্র একজন ডাক্তার দিয়ে এত বড় উপজেলার কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়।"
স্থানীয় বাসিন্দা লিটন হাওলাদার বলেন, "এই পশু হাসপাতালে আমরা সঠিকভাবে সেবা পাচ্ছি না। কারণ, এখানে লোকসংখ্যা খুবই কম। সরকার যদি এখানে লোকসংখ্যা বাড়ায়, তাহলে আমরা ভালো সেবা পাব।"
খামারি মো. জুলফিকার খান জানান, তার ২০-২৫টি গরু রয়েছে। তিনি বলেন, "পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া খুবই জরুরি। কিন্তু অনেক সময় হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক বা জনবল পাওয়া যায় না। তখন বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। এতে একদিকে সময় নষ্ট হয়, অন্যদিকে চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়।"
সদর উপজেলা দপ্তরের ড্রেসার কার্তিক চন্দ্র হাওলাদার বলেন, "আমাদের এখানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদসংখ্যা ১১টি। আমরা এখানে আছি মাত্র দুজন। আমাদের কাছে যারা সেবা নিতে আসেন, জনবল সংকটের কারণে তাদের সেবা দিতে কিছুটা বেগ পেতে হয়। আমাদের ভবনের অবস্থাও খুব নাজুক। বৃষ্টি হলেই কক্ষের ভেতরে পানি পড়ে। ভবনটিও জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা প্রয়োজন। সরকারের কাছে আবেদন করি, যেন আমাদের এখানে জনবলের ঘাটতি পূরণ করা হয় এবং ভবনটিও মেরামত করা হয়।"
মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহা. নুর আলম বলেন, "এটি একটি বড় উপজেলা। এত বড় উপজেলায় অর্ধেকের কম জনবল নিয়ে সেবা দেওয়া খুবই কঠিন। মাঠপর্যায়ে টিকা প্রদান, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও উঠান বৈঠক কার্যক্রমে গতি আসছে না। মাঠপর্যায় থেকে চিকিৎসার জন্য যে খবরগুলো আসে, দ্রুত সময়ের মধ্যে চিকিৎসা দিতে সমস্যা হচ্ছে। তবে এখানে কোনো ওষুধের সংকট নেই। তবুও আমরা নিয়মিত সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।"
জিয়ানগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. মহিউদ্দিন বলেন, "আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে আছি। আমাদের এখানে রাজস্বের মোট ১১টি পদ আছে। এর মধ্যে আটটি পদই ফাঁকা রয়েছে। হেড অফিস থেকে রিপোর্ট চেয়েছিল, আমরা একাধিকবার রিপোর্ট পাঠিয়েছি; কিন্তু আশানুরূপ ফল পাইনি। আমাদের অফিসে দুজন ক্যাডার কর্মকর্তা থাকার কথা, কিন্তু আমি একাই আছি। একসঙ্গে ফিল্ড ও অফিস সামলানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কাজ হচ্ছে ফিল্ড লেভেলে বেশি। আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি, তবে কোয়ালিটিপূর্ণ যে সেবাটা দরকার, সেটা দিতে পারছি না। এ ছাড়া অফিসের সার্বিক কার্যক্রম চালাতেও আমাদের কষ্ট হচ্ছে।"
তিনি আরও জানান, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় চার-পাঁচজন কর্মীর অভাব এখন প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তরুণ কুমার সিকদার বলেন, "আমাদের জেলা অফিসসহ সাতটি উপজেলায় ব্যাপক জনবল শূন্য রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ জনবল সংকটের কারণে আমাদের বিশাল কার্যক্রম পরিচালনা কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। তারপরও আমাদের যে জনবল রয়েছে, তা দিয়ে মানুষকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া আমাদের দপ্তরের যে সংযোগ সড়ক আছে, সেটির অবস্থাও খুবই বেহাল এবং সদর প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের ভবনটিরও খুবই নাজুক অবস্থা। আশা করি, আমাদের এই জনবল সংকটসহ যেসব সমস্যা রয়েছে, তা দূর হলে অফিসগুলো স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং সেবার মান আরও বৃদ্ধি পাবে।"