শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চলের চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশানের পরিধি বৃদ্ধির কাজ চলাকালে মাটির নিচ থেকে একের পর এক মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এই ঘটনা ঘটে, যার পরপরই তদন্ত শুরু হয় এবং সেখানে একটি বিশাল গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক দলের তত্ত্বাবধানে চলমান খননকাজের তৃতীয় ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত মোট ৫৭২টি কঙ্কাল বা দেহাবশেষ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ও নবজাতকদের দেহাবশেষও রয়েছে। এছাড়া কবরে চুড়ি, একটি স্কুলব্যাগ এবং একটি ফিডারও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো এটিকে শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবর হিসেবে চিহ্নিত করছে।

জাফনায় গণকবর থাকা নিয়ে আগে থেকেই কানাঘুষা ছিল। দেশটির ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়া এক সেনাসদস্য বলেছিলেন, সেখানে একটি গণকবর রয়েছে, যেখানে শত শত মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি ছিল, এসব মরদেহ গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বেসামরিক মানুষদের। কিন্তু এত দিন এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

শ্রীলঙ্কায় কয়েক দশক ধরে চলা গৃহযুদ্ধে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া হাজারো মানুষের মধ্যে জয়ারুবি জয়াবালানের বাবাও ছিলেন। তিনি ও তাঁর মতো অন্য পরিবারগুলো এখন আশা করছেন, তাঁদের স্বজনদের সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো এসব মরদেহের মধ্যেই রয়েছে। অনেক তামিল মনে করেন, এই গণকবরে গৃহযুদ্ধের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তিদের মরদেহ রয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে।

তবে চেম্মানিতে খননকাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। এতে নিখোঁজ স্বজনদের কী হয়েছিল, সেই উত্তর খুঁজতে থাকা পরিবারগুলোর ধৈর্যের আরও পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। এর আগে শনাক্ত হওয়া একটি গণকবরে কয়েক শ দেহাবশেষের সন্ধান পাওয়ার পর থেকে তামিলদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা গৃহযুদ্ধের সময়ের নিখোঁজের ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অনেকের আশঙ্কা, সত্য উদ্‌ঘাটনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে শেষ পর্যন্ত এই গণকবরের ঘটনাও মানুষের মনোযোগের আড়ালে চলে যাবে। এ কারণে শ্রীলঙ্কার উত্তরাঞ্চলে নতুন করে শুরু হওয়া বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই গণকবর।

শ্রীলঙ্কায়, বিশেষ করে তামিল-অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে কয়েক দশক ধরে সংঘাত চলেছে। ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা এই গৃহযুদ্ধে তামিল টাইগার বিদ্রোহীরা দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছিল। তাদের দাবি ছিল, সিংহলি-প্রধান সরকার তামিলদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈষম্য করে আসছিল। ১৯৯৫ সালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলমের (এলটিটিই) কাছ থেকে জাফনা উপদ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এটিকে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হয়। সে সময় কেউ কেউ জাফনা অঞ্চলকে ‘উন্মুক্ত কারাগার’ বলে বর্ণনা করতেন। অভিযোগ উঠেছিল, সেখানে সে সময়ে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পেছনে সেনাবাহিনীর হাত রয়েছে। যদিও শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সরকার বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটে। ২৬ বছর ধরে চলা এই গৃহযুদ্ধে প্রায় ১ লাখ মানুষ নিহত হন। এ ছাড়া প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাঁদের বেশির ভাগই তামিল। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।