বরিশালে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় গণমাধ্যমের পেশাগত মান উন্নয়ন ও পাঠক-দর্শকের আস্থা অর্জনে স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সংবাদ প্রকাশে ভুল হলে তা স্বীকার ও সংশোধন, পাঠকদের অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এই স্বনিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি বলে বক্তারা মনে করেন।
সোমবার বরিশালে মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় সংবাদমাধ্যমের মালিক, প্রকাশক, সম্পাদক, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের নৈতিক মানোন্নয়ন ও স্বনিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে এ সভাটির আয়োজন করা হয়। কার্যক্রমটি কানাডা ফান্ড ফর লোকাল ইনিশিয়েটিভস (সিএফএলআই)-এর আওতায় হাইকমিশন অব কানাডা ইন বাংলাদেশের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
সভায় বক্তারা বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা কেবল দ্রুত সংবাদ প্রচারের ওপর নির্ভর করে না। ভুল সংশোধনের ক্ষমতা, পাঠকের অভিযোগের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা—এই বিষয়গুলোই আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নীতিমালা, পেশাগত মানদণ্ড এবং দৃশ্যমান জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা আবশ্যিক।
এমআরডিআইয়ের নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, "গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় নিজস্ব জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। পাঠক, শ্রোতা ও দর্শকের আস্থা যত দিন থাকবে, গণমাধ্যম তত দিন স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। এই আস্থা ধরে রাখতে নিজেদের কাজের জন্য প্রতিষ্ঠানকে পাঠক-দর্শকের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।"
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার চেয়ে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গায় মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, "সরকার কী দিল বা দিল না, শুধু তা নিয়ে না ভেবে সংবাদমাধ্যমের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জায়গায় মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করতে হবে।"
চ্যানেল এসের নিউজ অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের পরিচালক রেজোয়ানুল হক স্বনিয়ন্ত্রণের অন্যতম শর্ত হিসেবে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও কর্মীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো কর্মী ছাঁটাই বা পদত্যাগ করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁর পাওনা পরিশোধের বিধান নীতিমালায় থাকতে হবে।
সভায় বক্তারা অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া স্থাপনেরও দাবি জানান। যদি অভিযোগ যথার্থ হয়, তবে সংশোধনী বা ব্যাখ্যা প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যমের জবাবদিহি আরও দৃশ্যমান করা যায়। সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে আলোচনায় বলা হয়, পেশাগত নৈতিকতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। সময়মতো বেতন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র, আইনানুগ সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশকে গণমাধ্যমের জবাবদিহি কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি আমিনুল ইসলাম; দৈনিক আজকের পরিবর্তনের সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ; বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আনিসুর রহমান; বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি সাইফুর রহমান; বাংলাদেশ বাণীর সম্পাদক ও বরিশাল জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আযাদ আলাউদ্দীন; জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হাফিজুর রহমান; সনাক বরিশালের সভাপতি টুনু কর্মকার; দৈনিক মতবাদের যুগ্ম সম্পাদক হেনরী স্বপন; সাপ্তাহিক জাগো নারীর সম্পাদক গোপাল সরকার; বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. ফরহাদ উদ্দীন; একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. ইসরাত জাহান; আভাসের উপনির্বাহী পরিচালক জান্নাতুন নাঈম; পটুয়াখালীর দৈনিক গণদাবীর সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া; দৈনিক পিরোজপুর কণ্ঠের সম্পাদক ফসিউল ইসলাম; দৈনিক আজকের ভোলার সম্পাদক মুহাম্মদ শওকাত হোসেন; ঝালকাঠির দৈনিক দূরযাত্রার সম্পাদক জিয়াউল হাসান; ভোলা প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন; পটুয়াখালীর সোসাইটি ডেভেলপমেন্ট এজেন্সির নির্বাহী পরিচালক কে এম এনায়েত হোসেন; পিরোজপুর গণ উন্নয়ন সমিতির নির্বাহী পরিচালক জিয়াউল আহসান এবং সনাক ঝালকাঠির সভাপতি সত্যবান সেন গুপ্ত।