বকেয়া পেনশনের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে পাওনার অতিরিক্ত টাকা ব্যাংক হিসাবে পাঠানো এবং পরে সেই টাকা সরিয়ে নেওয়ার আরও তথ্য সামনে এসেছে। এবার চট্টগ্রামের হালিশহর সেনানিবাসের ফিল্ড পে পেনশন কার্যালয়ের জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে। এ কার্যালয় থেকে সাতজনের নামে পেনশনের এক কোটির বেশি টাকা সরিয়ে নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন পেনশনভোগীও নন।

এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর মুক্তকণ্ঠয় প্রকাশিত ‘পেনশনের নামে সরকারি টাকা আত্মসাৎ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ঢাকা সেনানিবাসের সিসিডিএফ কার্যালয়ে পেনশনের বাইরে সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ২৬ পেনশনভোগীর নামে বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে ৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা সরানোর তথ্য উঠে আসে। প্রাথমিক তদন্তের পর এ ঘটনায় জড়িত সিসিডিএফ কার্যালয়ের সাবেক দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এবার চট্টগ্রামের ফিল্ড পে কার্যালয়ে জালিয়াতির চিত্র সামনে এল।

ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত করে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তবে এবার গভীর অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

পেনশনভোগী না হয়েও বকেয়া পেনশনের নামে টাকা পেয়েছেন সিহাব হোসেন। তিনি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য শাহাদাত হোসেনের ছেলে। তাঁর ব্যাংক হিসাবে কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা পাঠানো হয়। সেনাবাহিনীর আরও ছয় অবসরপ্রাপ্ত সদস্যের ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রামের ফিল্ড পে কার্যালয়ের (আর্টিলারি) কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে এই সাতজনের নামে বকেয়া পেনশন বিল তৈরি করে ১ কোটি ২ লাখ ৪২ হাজার ৬০৪ টাকা সরানো হয়েছে। এসব বিলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

পেনশন পরিশোধের সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থা আইবাস প্লাস প্লাস (ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম) ব্যবহার করে এসব অর্থ পাঠানো হয়। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের লেনদেন যাচাইয়ে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব বিল তৈরিতে ওই কার্যালয়ের সাবেক অডিট কর্মকর্তা (বর্তমান পে-১ কার্যালয়ে কর্মরত) বিথীন কুমারের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ১০ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের প্রধান হিসাব কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে বিথীন কুমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সিহাব হোসেন মুক্তকণ্ঠের কাছে দাবি করেন, বিথীন কুমার তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁর বাবা শাহাদাত হোসেনের বকেয়া পেনশনের কথা বলে অতিরিক্ত টাকা পাঠান। এরই মধ্যে তিনি ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা ফেরত দিয়েছেন। এর বাইরে তিনি কিছু জানেন না।

ফিল্ড পে কার্যালয়ের (আর্টিলারি) সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, দুজন কর্মকর্তা পেনশনের নথি থেকে অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বকেয়া পেনশন হিসেবে অতিরিক্ত টাকা পাঠানো হতো। চুক্তি অনুযায়ী কাউকে কমিশন দিত, কাউকে ব্যবসার কথা বলে টাকা দিত, আবার কাউকে ভুলে টাকা চলে গেছে বলে পরে ফেরত নিয়েছে।

সিহাব হোসেন ছাড়া অন্যদের মধ্যে সার্জেন্ট মাসুদ রানার ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৩১ লাখ, সার্জেন্ট আবুল নাহার খানের হিসাবে প্রায় সাড়ে ২২ লাখ, করপোরাল মো. বদরুজ্জামানের হিসাবে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ, হাবিলদার লুৎফর রহমানের হিসাবে প্রায় ১৪ লাখ, সার্জেন্ট নাছিমা আলীর হিসাবে ১০ লাখ ১১ হাজার, ল্যান্স করপোরাল রুখুন উদ্দিন খানের হিসাবে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের হালিশহর সেনানিবাসের ফিল্ড পে কার্যালয়ের সাবেক অডিটর বিথীন কুমার ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং কর্মকর্তার (ডিডিও) আইবাসের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাতজনের ব্যাংক হিসাবে অতিরিক্ত টাকা পাঠিয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিথীন কুমারের বাড়ি নাটোর জেলায়। পেনশনভোগী মাসুদ রানার বাড়িও একই জেলায়। মাসুদ রানা চাকরি থেকে অবসরের পর ভুসিমালের ব্যবসা করেন। মাসুদ রানার সঙ্গে ব্যবসায়ের কথা বলে বিথীন কুমার চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে মোট ৩১ লাখ টাকা পাঠান। সেই টাকা দিয়ে কিছু মালামাল কেনেন, আর বাকি টাকা বিথীন কুমারকে ফেরত দেন। বাকি পেনশনভোগীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করতেন বিথীন।

কার্যালয়–সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চুক্তিতে রাজি হওয়া পেনশনভোগীদের কমিশন দিয়ে বাকি অর্থ বিথীন কুমারের বোনজামাই প্রদ্যুত কুমারের দুটি ব্যাংক হিসাবে ফেরত নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অগ্রণী ও সোনালী ব্যাংকের হিসাব দুটি নাটোর সিংড়া শাখার।

মাসুদ রানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আটা, ময়দা ও ভুসি কিনে দেওয়ার কথা বলে বিথীন কুমার তাঁকে টাকা পাঠান। পরে কিছু টাকা ফেরতও নেন। তবে তা পেনশনের টাকা কি না, তিনি জানেন না।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিথীন কুমারের মুঠোফোনে কল দিলে পরে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন। রাতে চেষ্টা করেও আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে তাঁর মুঠোফোনে অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

আইবাসের মাধ্যমে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় থেকেই সরকারি কর্মচারীদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের (জিপিএফ) ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ২০০ টাকা জালিয়াতি করে সরানো হয়েছে। গত ১৬ আগস্ট ওই কার্যালয়ের জিপিএফ হিসাব যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। যাচাই কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এভাবে আইবাস ব্যবহার করে একের পর এক অর্থ সরানোর ঘটনা সামনে আসায় আইবাস ব্যবহারে সতর্কতা জারি করেছে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের (সিজিএ) কার্যালয়।

সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের পেনশনের টাকা নিয়ে জালিয়াতির তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি আরও গভীরভাবে অনুসন্ধানে নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর কন্ট্রোলার জেনারেল ডিফেন্স ফাইন্যান্স (সিজিডিএফ) কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এ কে এম হাছিবুর রহমান গতকাল রোববার রাতে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনাটি সামনে আসার পর তদন্ত করে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তবে এবার গভীর অনুসন্ধান করা হচ্ছে।’ প্রতিবেদন দিতে আরও দু-তিন দিন লাগতে পারে বলে জানান তিনি।