রাত তখন পৌনে সাতটা। হঠাৎ বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে আশপাশ, মুহূর্তেই আগুন জ্বলে ওঠে। কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আশপাশ। দোকানপাট ও বিভিন্ন স্থাপনার কাচের জানালা ভেঙে পড়ে। একে একে কয়েকটি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
গতকাল রোববার রাতে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রিটি গ্রুপের একটি কারখানা চত্বরে সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ও আগুন লাগার ঘটনায় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এ বর্ণনা দিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, একের পর এক বিকট শব্দে আগুন ছড়িয়ে পড়তে থাকলে আতঙ্কে আশপাশের মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন। সবজি বিক্রেতা ও দোকানদারেরা দোকান ফেলে দৌড়ে এলাকা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় দরজির দোকানদার মোবারক হোসেন (৫৫) মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দোকানে কাম করতাছিলাম। হুট করে জোরে শব্দ হয়। আমার দোকানের গ্লাস ভেঙে পড়ে। চারদিকে কালা ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়। কোনোরহমে দোকান থেকে বের হয়ে চলে যাই। এতে প্রাণে বাঁচি গেছি।’
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে একটি দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষের দেয়াল ভেদ করে লোহার একটি টুকরা ঢুকে যায়। এতে দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং দুটি বড় বৃত্তাকার ছিদ্র হয়েছে। এ সময় ওই বাসায় ছিলেন গৃহিণী নাজমা ও তাঁর মেয়ে।
নাজমা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি রুমেই ছিলাম। ফোনে একটা কল আসাতে পাশের ডাইনিং রুমে গেছি কথা বলতে। দুই মিনিট পর বিল্ডিংয়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে অবস্থা হয়েছে। রুমের আসবাবপত্র ও দেয়ালের ইট ভেঙে ছড়িয়ে গেছে।’
নাজমা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমি ভয়ে আমার মেয়েকে নিয়ে দ্রুত দৌড়ে নিচে নেমে আসি। ভবনটি করেছি এখনো ছয় মাস হয়নি। এর মধ্যে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটল। আমাদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে?’
নাজমার বাড়ির মতো আশপাশের বিভিন্ন জায়গায়ও লোহার টুকরা ছিটকে গিয়ে ভবনে আঘাত হেনেছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে সিলিন্ডারও ছিটকে পড়েছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি মাজারসংলগ্ন বাড়িতে তিনটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিটকে পড়ে। এতে ওই বাড়ির টিনের চালের কিছু অংশ দুমড়েমুচড়ে গেছে। বাড়ির মালিক আইনাল মীর।
এর পাশের আরেকটি ভবনেও একটি গ্যাস সিলিন্ডার ছিটকে পড়ে। ওই বাড়ির মালিক ওয়ালী মীর মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দোকানে ছিলাম। আগুন লাগার ঘটনা শুনে দৌড়ে চলে আসি। এসে দেখি বাড়ির টিনের চালের ওপর একটি সিলিন্ডার পড়ে আছে। রুমের ভেতরে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।’
আজ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে একটি মাজারের পাশে মানুষের ভিড়। সেখানে একটি সিলিন্ডার পড়ে আছে। সেটি দেখছিলেন স্থানীয় লোকজন।
স্থানীয় বাসিন্দা আমেনা বেগম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এমন ঘটনা জীবনে দেখিনি। গতকাল একের পর এক বিকট শব্দ শুনেছি। পরে রাতে শুনলাম আগুন লেগেছে। মাজারের পাশে এত বড় একটা সিলিন্ডার উড়ে এসে পড়েছে। ভাবতেই গা শিউরে উঠছে।’
গতকাল রোববার রাতে এ ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধার করে। এ ছাড়া কারখানার অদূরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আরও এক নারী নিহত হন। আর ঢাকা মেডিকেলে গতকাল রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন। তাঁর নাম নজরুল ইসলাম (৩০)। তিনি একজন কাঁচামাল বিক্রেতা। ঢামেকের পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সেলিম হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, নজরুল ইসলামের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
সব মিলে সাভারে বিস্ফোরণের ঘটনায় এ পর্যন্ত সাতজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও কয়েকজন।
ঘটনার ২০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম। আজ দুপুর ১২টার দিকে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, যাঁরা নিহত হয়েছেন, তাঁদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে।