মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জান্নাকান্দি এলাকায় প্রবাসী একরাম হোসেন তার দ্বিতীয় স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা আক্তার ও শিশু কন্যা আলিজা নূরকে হত্যার পর আত্মহত্যার ঘটনায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত স্ত্রীর বড় বোন মিশু বেগম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছেন, যেখানে মৃত একরামকেও প্রধান আসামি করা হয়েছে। অন্যদিকে, একরামের মা তাহমিনা বেগম ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জান্নাকান্দি এলাকার নিজ বাড়ির একটি কক্ষ থেকে একরাম হোসেন (৪০), তার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা আক্তার (২২) এবং তাদের মেয়ে আলিজা নূরের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহগুলো মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মামলা দুটি তালিকাভুক্ত হয়। এর আগে শনিবার রাত ১২টার পর মানিকগঞ্জ সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করে বলেন, "ঘটনার নিবিড় তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।" তিনি আরও জানান, "ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত ও তদন্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনজনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।"
ওসি মৃত একরামের নামে মামলার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, "স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যার সময় তিনি জীবিত ছিলেন বলে তার নামে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে তার মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।"
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, একরাম প্রথমে তার স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে হত্যা করেন। এরপর স্ত্রীর ওড়না ব্যবহার করে বৈদ্যুতিক পাখার সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। তবে ঘটনার পেছনে অন্য কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, একরামের প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে কয়েক বছর আগে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর প্রায় আড়াই বছর আগে প্রিয়াঙ্কা আক্তারের সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাদের সংসারে জন্ম নেয় মেয়ে আলিজা নূর। একরাম দীর্ঘদিন সৌদি আরবে ছিলেন। তিনি নূর হক ডাক্তারের ছেলে এবং মা তাহমিনা বেগম, ভাই ও ভাবির সাথে একই বাড়িতে থাকতেন।
একরামের এক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "প্রিয়াঙ্কার অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, এমন সন্দেহ ছিল একরামের। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্যও ছিল।" তবে এসব তথ্যের সত্যতা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার পর প্রিয়াঙ্কার বড় বোন মিশু বেগম বাদী হয়ে সদর থানায় হত্যা মামলা করেন, যেখানে নিহত একরাম হোসেনকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। প্রিয়াঙ্কার ভাই ইয়াসিন বলেন, "তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর খবর অনেক দেরিতে জানানো হয়েছে। এ কারণে তার বোন ও ভাগনিকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের সন্দেহ হচ্ছে।" তিনি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।
কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য লোকমান হাদী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "একরামের স্ত্রীর পরকীয়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা কথা শুনেছি। তবে বিষয়টি আমি নিশ্চিতভাবে জানি না। বিদেশে থাকাকালে একরাম ভালো মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সম্প্রতি দেশে ফেরার পর তার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। পারিবারিক কোনো বিষয় থেকে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে হয়।"
পুলিশের পাঠানো মরদেহগুলোর ময়নাতদন্ত শেষে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।