২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম বড় ধরনের সাংগঠনিক পরীক্ষায় নামছে বিএনপি। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রস্তুতির পাশাপাশি দলীয় স্তরেও হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে হাইকমান্ড। দলীয় প্রতীকবিহীন এই নির্বাচনে ভোট বিভাজন রোধ এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রতিটি আসনে শুধু একজন যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে। কোনো নেতাকর্মী সিদ্ধান্ত অমান্য করে ‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বা দল থেকে স্থায়ী বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
একক প্রার্থী সমর্থনের কৌশলগত ৩ কারণ
বিএনপির নীতি-নির্ধারকদের মতে, একক প্রার্থী নিশ্চিত করার পেছনে প্রধানত তিনটি মূল রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে।
ভোট বিভাজন রোধ: যেহেতু স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকবিহীন হচ্ছে, তাই একই দল থেকে একাধিক প্রার্থী দাঁড়ালে সাধারণ ভোটারদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি হবে। দল সমর্থিত একজন মাত্র প্রার্থী থাকলে বিএনপির মূল ভোটব্যাংক এক জায়গায় জমা থাকবে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণ: একই আসন থেকে একাধিক নেতাকর্মী মাঠে নামলে দলে উপদল ও গ্রুপিং তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দলের জন্য ক্ষতিকর।
প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মোকাবিলা: বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংসদীয় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে অধিকাংশ এলাকায় একক প্রার্থী চূড়ান্ত করে মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ শুরু করেছে। পাশাপাশি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) মতো নতুন রাজনৈতিক দলগুলোও শক্তিশালী প্রার্থী দিচ্ছে। এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে জয়ী হতে বিএনপির মধ্যে একতা বজায় রাখা অত্যাবশ্যক।
প্রার্থী নির্বাচনের ৩ মূল মাপকাঠি
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, একক প্রার্থী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মূলত তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
জনপ্রিয়তা ও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা: এলাকায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছ ভাবমূর্তি এবং সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা।
সাংগঠনিক সক্রিয়তা ও ত্যাগ: অতীতে দলের কঠিন সময়ে ও আন্দোলন-সংগ্রামে প্রার্থীর সক্রিয় ভূমিকা এবং ত্যাগের মূল্যায়ন।
আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রতীকবিহীন নির্বাচন হওয়ায় দলগতভাবে সরাসরি মনোনয়ন দেওয়া হবে না, তবে ভোট বিভাজন রুখতে কেন্দ্র সমর্থিত একক প্রার্থী সুনিশ্চিত করা হবে।
তিনি জানান, কেন্দ্র থেকে জোর করে কোনো প্রার্থী চাপিয়ে দেওয়া হবে না। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রার্থী নির্বাচনের দায়িত্ব থাকবে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা নেতাদের ওপর, যারা মাঠপর্যায়ে জরিপ চালিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম পাঠাবেন। জেলা ও বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদকদের নিয়ে একটি লিয়াজোঁ বা সমন্বয় সেল গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা তৃণমূলের কোন্দল বা বিরোধ মীমাংসা করবেন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, আগামী বছরের ৬ জুন এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তবে ভোট শুরুর সঠিক তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও মহানগরের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করছেন। তার স্পষ্ট নির্দেশ—নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শতভাগ অনুগত থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে একক প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামতে হবে এবং জনগণের মন জয় করে বিজয়ী হতে হবে।
দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্যকারীদের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু স্পষ্ট বলেন, দল বড় হওয়ায় একাধিক প্রার্থী থাকা স্বাভাবিক হলেও আলোচনার মাধ্যমে একক প্রার্থী ঠিক করা হবে। এরপরও কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী বহিষ্কারের মতো কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, প্রার্থীর সততা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও ত্যাগের ভিত্তিতেই সমর্থন দেওয়া হবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে অনেক ক্ষেত্রে পদে থাকা নেতাদের পদ ছাড়ার নিয়ম করার চিন্তাভাবনা চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নির্দলীয় নির্বাচনে একজনকে সমর্থন দিলে ক্ষুব্ধ বাকি প্রার্থীরা গোপনে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারেন, যা বিএনপির মূল ভোটব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তবে ধীরে চলো নীতিতে এগোনো এই প্রস্তুতি দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের পুনরায় চাঙ্গা ও সক্রিয় করতে একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।
মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) বা প্রভাবশালী নেতাদের বলয় যাতে প্রভাব ফেলতে না পারে, সেদিকে কড়া নজর রাখছে কেন্দ্র। ইউনিয়ন ও পৌরসভা পর্যায়ে স্থানীয় নেতৃত্ব সমন্বয় করলেও সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কেন্দ্র সরাসরি তদারকি করবে এবং চূড়ান্ত প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক পরিচয় করিয়ে দেবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ এক দশক পর মুক্ত পরিবেশে নির্বাচন হতে থাকায় হাজার হাজার তৃণমূল নেতা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ইচ্ছুক। তাদের ক্ষোভ সামলে একক প্রার্থী নিশ্চিত করাটা বিএনপির জন্য বড় একটি পরীক্ষা। শুধু ‘দলীয় আনুগত্য’ না দেখে স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে না নিলে এই কৌশল বুমেরাং হতে পারে।
সার্বিক নির্বাচন পরিস্থিতি সম্পর্কে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করতে সরকার যথাসময়ে নির্বাচন কমিশনকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।