ঝালকাঠির সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশ ধরার মৌসুম শেষের দিকে এসেও জেলেরা প্রত্যাশিত আয় পাননি। ফলে নৌকার জ্বালানি, জাল সংস্কার এবং দৈনন্দিন খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অথচ এনজিওর ঋণের কিস্তি এবং মহাজনের দাদন শোধের চাপ মাথার ওপর। সামনে ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার কথা, যা জেলেরাদের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া, দেউরি গ্রামের সুগন্ধা নদীর তীর এবং বাদুরতলা, চল্লিশকাউনিয়া এলাকার বিষখালী নদীর পাড়ে গিয়ে জেলেরা জানান, ইলিশের মৌসুমে তারা কয়েক মাস আগে থেকেই নৌকা মেরামত ও নতুন জাল কেনার জন্য ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু এবার নদীতে ইলিশের অভাব তাদের পরিকল্পনা ভেঙে দিয়েছে। একই অভিযোগ উঠেছে নলছিটি উপজেলার মাটিভাঙ্গা এলাকার জেলেরা থেকেও।

৬৫ বছর বয়সী দেউরি গ্রামের জেলে নুরু মিয়া বলেন, "আমার বয়স ৬৫ বছর। জীবনের প্রায় পুরোটা সময়ই সুগন্ধা আর বিষখালী নদীতে মাছ ধরে কাটিয়েছি। নদীর কোন জায়গায় কখন ইলিশ থাকে, কোথায় জাল ফেললে মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি—এসব অনেক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে জানি। কিন্তু এবার নদীর অবস্থা একেবারেই আলাদা। জাল ফেলছি, নদীতে ঘুরছি, কিন্তু আগের মতো ইলিশ পাচ্ছি না। কখনো সারাদিনে যে পরিমাণ মাছ পাই, তা দিয়ে নৌকার তেলের খরচও ঠিকমতো ওঠে না।"

তিনি যোগ করেন, এই বয়সে নদীতে না নামার কোনো উপায় নেই। ইলিশের মৌসুমে ভালো মাছ পেয়ে কিছু টাকা জমানোর আশায় সারা বছর অপেক্ষা করলেও, এবার মাছ কম থাকায় তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। সামনে নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে মাছ ধরা বন্ধ থাকবে, কিন্তু ঋণের কিস্তি বন্ধ থাকবে না।

আকাববর মৃধা ছেলেকে নিয়ে নদীতে মাছ ধরেন। তিনি জানান, নৌকা ও জাল ঠিক করতে ঋণ করেছিলেন, যা মৌসুমের আয় দিয়ে শোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ইলিশ না পাওয়ায় আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বাড়ছে। আকাববর মৃধা বলেন, "ইলিশের মৌসুম আসার আগে নৌকা-জাল ঠিক করতে অনেক টাকা খরচ করছি। সেই টাকা নিজের ছিল না, ঋণ করে নিতে হয়েছে। ভেবেছিলাম, মৌসুমে ভালো মাছ পাব, মাছ বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব, সংসারও চালাব। কিন্তু নদীতে আগের মতো ইলিশ নেই। সারাদিন নদীতে ঘুরেও অনেক সময় তেমন মাছ পাই না। নৌকার তেল, জাল আর অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে তেমন কিছুই থাকে না।"

বাদুরতলা এলাকার কাদের মাঝিও একই দুর্দান্তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিষখালী নদীতে বছরের পর বছর মাছ ধরে সংসার চালিয়েছেন, কিন্তু এবার আশানুরূপ ইলিশ পাচ্ছেন না। সারাদিন নদীতে থাকার পর যে মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে নৌকার তেল ও জালের খরচও ওঠে না। কাদের মাঝি বলেন, "নৌকা-জাল ঠিক করার জন্যও টাকা ধার করেছি। আশা ছিল ইলিশ ধরে সেই টাকা পরিশোধ করব। এখন মাছ কম পাওয়ায় কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব, সেটাই বুঝতে পারছি না। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে তো নদীতে নামতেও পারব না। তাই সামনে কীভাবে সংসার চলবে, তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি।"

কাঁঠালিয়া-বেতাগী সীমান্তবর্তী এলাকার জেলে আখের আলী জানান, সারা বছর ইলিশের মৌসুমের ওপর নির্ভর করে তাদের আয়। কিন্তু এবার নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম থাকায় প্রত্যাশিত আয় হয়নি। আখের আলী বলেন, "একদিকে এনজিওর ঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া দাদনের টাকাও পরিশোধ করতে হবে। মাছ কম পাওয়ায় সেই টাকা কীভাবে শোধ করবেন, সেটিই এখন তাদের বড় চিন্তা।"

প্রতি বছর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ আহরণের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে গণ্য হয়। এই সময়ে সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে কয়েক শ জেলে মাছ ধরেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে ইলিশ না পাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা সংকটে পড়েছে। নদীতে মাছ না থাকলে শুধু আয়ই কমে না, ধারদেনাও বাড়ে, কারণ জ্বালানি, বরফ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ হয়।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এনামুল হক জানান, দেশের অন্যান্য এলাকায় ইলিশের ঝাঁক ধরা পড়লেও সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে এর উপস্থিতি কম। তিনি বলেন, "দেশের অন্যান্য জেলার নদ-নদীতে এ বছর ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়লেও সেই তুলনায় সুগন্ধা ও বিষখালী নদীতে ইলিশের উপস্থিতি কম। নদীর পানিদূষণ ও পলি জমার কারণে এমনটা হতে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।" ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় ইলিশ আহরণ করা সম্ভব হয়নি।