বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) সংক্রান্ত ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১২ হাজার ২০০ টাকা জালিয়াতির ঘটনায় ছয়জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে চারজন সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং দুজন অডিটর অন্তর্ভুক্ত।

গত ১৫ সেপ্টেম্বর হিসাব মহা-নিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী এবং ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মো. নুরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯ ধারার উপধারা (১) অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজেদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অনলাইন ব্যবস্থায় জিপিএফ অগ্রিম বিলের বিপরীতে ভুয়া বিল তৈরি ও অনুমোদনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ের জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাই করতে গিয়ে কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাদের হিসাবের সঙ্গে গরমিল দেখতে পান। জিপিএফ থেকে ঋণ নেওয়ার সময় বিষয়টি তাদের নজরে আসে।

অভিযুক্তদের মধ্যে সর্বোচ্চ অঙ্কের জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে মীর এনামুল হকের বিরুদ্ধে। তদন্ত প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। জালিয়াতির বিষয়টি উদ্ঘাটনের সময় তিনি রামপাল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে, সৌমেন সরকারের বিরুদ্ধে ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা, মদন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ১২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মদন কুমার দাস বর্তমানে বাগেরহাটের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার (ডিএফএও) কার্যালয়ে কর্মরত। হাসানুজ্জামান খুলনা বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার এবং সৌমেন সরকার খুলনার তেরখাদা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

অডিটর শ্যামল কুমার দাসের বিরুদ্ধে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত ৬৫টি ভুয়া বিল তৈরি করে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। জালিয়াতির বিষয়টি উদ্ঘাটনের সময় তিনি বাগেরহাটের মোংলায় কর্মরত ছিলেন। অপর অডিটর রুবেল মোল্লার বিরুদ্ধে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২টি ভুয়া বিলের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। ওই সময় তিনি বাগেরহাটের শরণখোলায় কর্মরত ছিলেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লিখিত ছয়জনের বিরুদ্ধে মোট ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১২ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। শিক্ষকরা জানান, তাদের জিপিএফের অর্থ নিয়ে এ ধরনের লেনদেনের বিষয়ে তারা আগে কিছুই জানতেন না। হিসাব যাচাইয়ের সময় কোনো কোনো শিক্ষকের হিসাবে একই দিনে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্যও পাওয়া যায়।

পরে মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী জিপিএফ হিসাব যাচাইয়ের জন্য খুলনার বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (ডিসিএ) কার্যালয়ে চিঠি দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির তদন্তে সাবেক চার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও দুই অডিটরের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ জালিয়াতির অভিযোগের তথ্য উঠে আসে।

এ বিষয়ে খুলনা ডিডিসিএ তামান্না ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশে আরও বলা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় অভিযুক্তরা প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তারা কেউ কর্মস্থল বা নির্ধারিত স্টেশন ত্যাগ করতে পারবেন না। তদন্তের প্রয়োজনে যেকোনো সময় তাদের উপস্থিত হতে হবে। আদেশটি জনস্বার্থে অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে বলেও অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।