সোনার গয়না নিয়মিত ব্যবহার করলে সময়ের সঙ্গে তার জেল্লা কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ে। ঘাম, ধুলো, সাবান, প্রসাধনী, মেকআপ ও বডি লোশনের আস্তরণ জমে গয়নার উজ্জ্বলতা কমিয়ে দেয়। অনেকেই তখন দোকানে গিয়ে গয়না পরিষ্কার করান। তবে সাধারণ ময়লা বা তেলতেলে ভাব দূর করতে পেশাদার পরিষ্কারের প্রয়োজন নেই। ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই কাজ চলে যায়, কিন্তু কোন গয়নায় কী ব্যবহার করছেন, সেটা জানা জরুরি। ভুল পদ্ধতিতে পরিষ্কার করলে গয়নায় আঁচড় লাগতে পারে, পালিশ নষ্ট হতে পারে কিংবা রত্নপাথরের ক্ষতি হতে পারে।

কেন সোনার গয়না মলিন হয়

সোনা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ধাতু, তবে গয়না তৈরিতে অন্য ধাতু মেশানো হয়। ব্যবহারের সময় ত্বকের তেল, ঘাম, ধুলো, সাবান, প্রসাধনী ও লোশন জমে গয়নার ওপর পাতলা আস্তরণ তৈরি করে। আংটি, চেন ও নকশা করা গয়নার খাঁজে ময়লা বেশি জমতে পারে। ফলে ধাতুর স্বাভাবিক ঝলক কমে যায়।

সাবান ও হালকা গরম পানিই সবচেয়ে নিরাপদ

সাধারণ সোনার গয়নার জন্য হালকা গরম পানি ও মৃদু তরল সাবান তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি। একটি ছোট পাত্রে হালকা গরম পানি নিন, পানি যেন খুব গরম বা ফুটন্ত না হয়। পানিতে কয়েক ফোঁটা মৃদু তরল সাবান মিশিয়ে নিন। সাধারণ সোনার গয়না ওই পানিতে কয়েক মিনিট থেকে ১০ বা ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে পারেন। এরপর নরম ব্রাশ বা বেবি টুথব্রাশ দিয়ে গয়নার খাঁজ ও নকশার জায়গাগুলো খুব আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। পরিষ্কার পানিতে ভালোভাবে ধুয়ে নিন। সবশেষে নরম সুতি বা মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে পানি মুছে সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিন। ছোট গয়না পরিষ্কারের সময় সিঙ্কের খোলা ড্রেনের ওপর কাজ না করাই ভালো। একটি পাত্র বা বন্ধ ড্রেন ব্যবহার করলে গয়না হাত থেকে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।

বেকিং সোডা ব্যবহার করবেন?

অনেক ঘরোয়া পরামর্শে সোনার গয়নায় বেকিং সোডার পেস্ট ব্যবহার করতে বলা হয়। কিন্তু এটি সব ধরনের সোনার গয়নার জন্য নিরাপদ পদ্ধতি নয়। বেকিং সোডা ঘষে পরিষ্কার করলে ধাতুর পালিশ করা পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম আঁচড় পড়তে পারে। তাই পুরোনো বা দামি গয়নায় বেকিং সোডা দিয়ে ঘষার পরিবর্তে মৃদু সাবান ও হালকা গরম পানির পদ্ধতিই বেশি নিরাপদ। বিশেষ করে গয়নায় রত্নপাথর থাকলে নিজের মতো করে কোনো ঘষামাজা করা উচিত নয়।

টুথপেস্ট দিয়ে সোনা পরিষ্কার করবেন না

সোনার গয়না চকচকে করতে টুথপেস্ট ব্যবহার করার পরামর্শ অনেক জায়গায় দেখা যায়। কিন্তু এটি এড়িয়ে চলাই ভালো। টুথপেস্টে থাকা ঘষে পরিষ্কার করার উপাদান সোনার পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম আঁচড় ফেলতে পারে। তাই গয়না পরিষ্কারের জন্য টুথপেস্ট ব্যবহার না করে মৃদু সাবান ও পানি ব্যবহার করুন।

হিরে, পান্না বা মুক্তো বসানো গয়নায় বাড়তি সতর্কতা

সাধারণ সোনার গয়না এবং রত্নপাথর বসানো গয়না একইভাবে পরিষ্কার করা ঠিক নয়। হিরে, পান্না, মুক্তো বা অন্য কোনো রত্ন বসানো গয়না পরিষ্কারের আগে পাথরটির ধরন জানা জরুরি। কিছু রত্ন পানি, রাসায়নিক বা অতিরিক্ত ঘষামাজার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে মুক্তো ও কিছু নরম বা ছিদ্রযুক্ত পাথরের ক্ষেত্রে সাধারণ ভেজানোর পদ্ধতি ব্যবহার না করাই ভালো। এ ধরনের গয়না হলে নরম, সামান্য ভেজা কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছে নেওয়া যেতে পারে। তবে দামি, পুরোনো বা নাজুক গয়না হলে পেশাদার জুয়েলারির পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

খুব গরম পানি ব্যবহার করবেন না

গয়না পরিষ্কারের সময় গরম পানি ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। হালকা গরম পানি যথেষ্ট। অতিরিক্ত তাপ কিছু রত্নপাথর, আঠা বা গয়নার সেটিংয়ের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গয়না পরিষ্কারের সময় ফুটন্ত পানি বা খুব গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো।

ব্লিচ বা শক্তিশালী রাসায়নিক থেকে দূরে রাখুন

বাড়িতে থাকা ব্লিচ, ক্লোরিন, অ্যাসিটোন, অ্যামোনিয়া জাতীয় শক্তিশালী রাসায়নিক দিয়ে সোনার গয়না পরিষ্কার করার চেষ্টা করবেন না। এসব উপাদান গয়নার ধাতু, পালিশ বা রত্নপাথরের সেটিংয়ের ক্ষতি করতে পারে। এ কারণে ঘর পরিষ্কারের সময়ও আংটি, চুড়ি বা অন্য সোনার গয়না খুলে রাখা ভালো। সুইমিং পুল বা হট টাবে যাওয়ার সময়ও গয়না খুলে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।

গয়না পরিষ্কারের সময় যে ভুলগুলো করবেন না

— জোরে ঘষবেন না: শক্ত ব্রাশ বা রুক্ষ কাপড় ব্যবহার করলে আঁচড় পড়তে পারে।
— খুব গরম পানি ব্যবহার করবেন না: হালকা গরম পানি যথেষ্ট।
— টুথপেস্ট ব্যবহার করবেন না: এতে গয়নার পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম আঁচড় পড়তে পারে।
— বেকিং সোডা দিয়ে ঘষবেন না: বিশেষ করে পালিশ করা বা নকশা করা গয়নায় এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
— খোলা ড্রেনের ওপর পরিষ্কার করবেন না: হাত থেকে পড়ে গেলে গয়না হারিয়ে যেতে পারে।
— রত্নপাথর বসানো গয়না না বুঝে ভিজিয়ে রাখবেন না: পাথরের ধরন ও সেটিং অনুযায়ী পরিষ্কারের পদ্ধতি আলাদা হতে পারে।

পরিষ্কারের পর কীভাবে রাখবেন?

গয়না পরিষ্কারের পর পুরোপুরি শুকিয়ে নিয়ে আলাদা করে রাখুন। একসঙ্গে অনেক গয়না রাখলে একটির সঙ্গে আরেকটির ঘর্ষণে আঁচড় পড়তে পারে। চেন, আংটি, কানের দুল ও চুড়ি আলাদা নরম কাপড় বা গয়না রাখার বাক্সে রাখলে ভালো। গয়না ব্যবহারের পর শরীরের ঘাম বা প্রসাধনীর আস্তরণ থাকলে নরম শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে রাখাও উপকারী।

কখন জুয়েলারির কাছে নিয়ে যাবেন?

গয়নায় পাথর নড়বড়ে হয়ে গেলে, কোনো অংশ আলগা মনে হলে, চেন বা ক্ল্যাস্প দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা গয়না খুব পুরোনো ও নাজুক হলে বাড়িতে পরিষ্কার না করাই ভালো। বিশেষ করে পুরোনো গয়না, জটিল নকশার গয়না, এনামেলযুক্ত গয়না বা সংবেদনশীল রত্নপাথর বসানো গয়নার ক্ষেত্রে পেশাদার পরিষ্কারের প্রয়োজন হতে পারে।

সোনার গয়না পরিষ্কার করতে সব সময় দামি কোনো ক্লিনার প্রয়োজন হয় না। সাধারণ সোনার গয়নার ক্ষেত্রে হালকা গরম পানি, মৃদু সাবান, নরম ব্রাশ এবং একটি নরম কাপড়ই যথেষ্ট হতে পারে। তবে গয়নায় রত্নপাথর থাকলে একই পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চকচকে করার জন্য গয়নায় জোরে ঘষাঘষি বা শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার না করা। একটু ধৈর্য নিয়ে সঠিক পদ্ধতিতে পরিষ্কার করলেই দীর্ঘদিন সোনার গয়নার উজ্জ্বলতা ধরে রাখা সম্ভব।

সূত্র: টিভি ৯ বাংলা