ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি একসঙ্গে থাকলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদা পথে হাঁটছে দুই দল। ১১ দলীয় জোটে পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখলেও সিটি নির্বাচনে দুই দলই এককভাবে নিজেদের শক্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
১১ দলীয় জোটের প্রধান দুই শরিকের এমন বিভাজনে কি ভোটের মাঠে সুবিধা পাবে ক্ষমতাসীন বিএনপি? মুক্তকণ্ঠের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত ও এনসিপি; দুই দলের নেতারাই বলছেন, পৃথক লড়াইয়েও বিএনপিকে পরাস্ত করা সম্ভব।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দলীয় মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীকে ঢাকা দক্ষিণ এবং মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঢাকা উত্তরের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ঘোষণা না দিলেও ইতোমধ্যেই ঢাকার দুই সিটিতে দলীয় মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রাথমিকভাবে ঢাকা উত্তরে মহানগর আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েমকে বাছাই করেছে দলটি।
ফলে ঢাকার দুই সিটিতেই এখন মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে দল দুটি, যদিও জাতীয় রাজনীতিতে তারা একই জোটের শরিক।
এ প্রসঙ্গে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করলেও দলের পূর্ববর্তী কার্যক্রম, প্রার্থীর যোগ্যতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার বিচারে ভালো ফল করবে। প্রতীকবিহীন নির্বাচনে কোনো বিশেষ দল বা মার্কাকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রকাশ পাবে না। এতে স্থানীয় রাজনীতিতে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি হবে। বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দুই দলের বিপরীতে এনসিপির প্রার্থীরা ভালো ফলাফল করবে।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের মনে করেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ হলে জামায়াত এককভাবে অংশ নিয়েও ভালো ফলাফল করতে পারবে।
তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, 'যেহেতু জামায়াত ও এনসিপি আলাদা নির্বাচন করছে এবং দলীয় প্রতীক থাকছে না, তাই প্রতিটি দল নিজ নিজ স্বার্থের সর্বোচ্চটুকু কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি বৈতরণি পার হওয়ার চেষ্টা করবে।'
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অবশ্য জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনের আগে একধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
রোববার রাতে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এনসিপি যেমন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হতে চায়, একই সঙ্গে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক বিস্তৃতিও চায়। এ কারণে দুই সিটি করপোরেশনে দুজন হেভিওয়েট প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যেন সংগঠন ও নির্বাচন একই গতিতে আগায়। পাশাপাশি সামনের দিনগুলোয় ঢাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নাশকতামূলক তৎপরতার আশঙ্কাও হিসেবে রাখছে এনসিপি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মনে করি নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে এবং ঢাকাবাসী তরুণ এনার্জেটিক মেয়র বেছে নেবে। নির্বাচনের আগে আগে যদি কোনো জোটগত বোঝাপড়া হয়, সেটা তখন হতে পারে।’
জামায়াত ও এনসিপির আলাদা লড়াইয়ে কি লাভবান হবে বিএনপি, এমন প্রশ্নে সারোয়ার তুষার বলেন, 'বিএনপি এতে শক্তিশালী হবে না, কারণ ঢাকার ভোটাররা এনসিপিকে স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে দেখতে চান। সেই স্বতন্ত্র বিবেচনাবোধ থেকেই সুইং ভোটগুলো এনসিপির দিকে আসবে। বিএনপি ও জামায়াত মূলত তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক ভোটই পাবে, আর এনসিপি পাবে সাংগঠনিক ভোটের পাশাপাশি সুইং ভোটও। এই হিসাবে ভোটের লড়াইয়ে এনসিপি ভালো অবস্থানে থাকতে পারে।'
প্রতীকবিহীন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও প্রচারণার ওপর। জামায়াত ও এনসিপি—দুই দলই তাদের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মী-সমর্থকদের ওপর ভরসা রেখে মাঠে নামছে, যা দলীয় প্রতীকভিত্তিক ভোট বিভাজনের সাধারণ হিসাব থেকে ভিন্ন।
ফলে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা মনে করছেন, পৃথক লড়াই সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন বিএনপিকে পরাস্ত করার সুযোগ তাদের হাতছাড়া হবে না। একই সঙ্গে সারোয়ার তুষার ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে কোনো জোটগত বোঝাপড়া হলে তা পরিস্থিতি আরও বদলে দিতে পারে।