দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের, বিশেষ করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নীতিমালা জারি করেছে। রোববার এই নতুন নির্দেশনা প্রকাশিত হয়, যাতে এমডি ও সিইওদের দায়িত্ব পালন ও পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য কীপাই (কেপিআই) পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নীতিমালার মাধ্যমে ১০০ নম্বরের একটি স্কেল তৈরি করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে শীর্ষ নির্বাহীদের কাজের মান যাচাই করা হবে। এই মূল্যায়নে খারাপ ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মূলধনভিত্তিক সক্ষমতা, সুশাসন, আর্থিক স্থায়িত্ব এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে যে, বিভিন্ন মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে ১০০ নম্বরের মধ্যে এমডি ও সিইওদের মূল্যায়ন করা হবে। যদি কোনো শীর্ষ নির্বাহীর ধারাবাহিকভাবে খারাপ পারফরম্যান্স দেখা যায়, তবে তাঁর মেয়াদ বৃদ্ধি না-ও হতে পারে। এমনকি খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে এমডিকে অপসারণের জন্য পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশ দেওয়া হতে পারে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে এমডি ও সিইওদের জন্য কেপিআই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা তিন বছর বা এমডির অবশিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রযোজ্য হবে। প্রতি ছয় মাস পরপর এসব লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করতে হবে এবং তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জানাতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এমডি ও সিইওদের বেতন-ভাতা, প্রণোদনা এবং অন্যান্য সুবিধা নির্ধারণেও এই স্কোরকার্ড ব্যবহার করতে হবে। প্রধান পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে এই স্কোরকার্ড যাচাই করতে হবে। স্কোরকার্ডে সূচকগুলোর মধ্যে তহবিল সুরক্ষা ও তারল্য পরিস্থিতির জন্য থাকবে ২৫ নম্বর, সম্পদের গুণগত মানের জন্য ২৫ নম্বর, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২৫ নম্বর, আর্থিক অন্তর্ভুক্তকরণ, গ্রাহকসেবা ও বাজার আচরণের জন্য ১৫ নম্বর এবং মুনাফা অর্জনের ওপর ১০ নম্বর। এই পাঁচ সূচকে মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে এমডি বা সিইও কেপিআই মূল্যায়ন করতে হবে। ১০০ নম্বরের মধ্যে কোনো এমডি ৭৫ বা তার বেশি নম্বর পেলে সেটি হবে মানসম্মত রেটিং। ৬৫ থেকে ৭৫-নম্বর পেলে ‘এভারেজ’ বা উন্নতি প্রয়োজন রেটিং পাবে এমডিরা। ৬৫-এর নিচে নম্বর পেলে ‘বিলো এভারেজ’ বা অবিলম্বে উন্নতি প্রয়োজন বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট এমডিকে নোটিশ দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক এমডিদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নে ন্যূনতম ৩০টি কেপিআই নির্ধারণ করেছে। যার মধ্যে ছয়টি প্রধান কেপিআই অর্জনে ব্যর্থতার জন্য নম্বর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে। কোনো কেপিআইয়ের নির্ধারিত টার্গেটের অন্তত ৫০ শতাংশ অর্জিত হলেই শুধু নম্বর পাওয়া যাবে। ৫০ শতাংশের কম অর্জন হলে ওই কেপিআইয়ে নম্বর মিলবে শূন্য (০)। তবে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি অর্জিত হলে আনুপাতিক হারে নম্বর যোগ হবে এবং শতভাগ অর্জিত হলে পূর্ণ নম্বর পাওয়া যাবে।
আমানত-ঋণ অনুপাত, মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত, প্রকৃত খেলাপি ঋণের অনুপাত, বড় ঋণ ও শীর্ষ ঋণগ্রহীতার কেন্দ্রীভূত ঝুঁকি, খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়, সিএমএসএমই, কৃষি, গ্রিন ফাইন্যান্স ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রসার—এই ছয়টি ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স ৫০ শতাংশের কম হলে বা শূন্য পেলে নম্বর কেটে নেওয়া হবে। এই নীতিমালার আওতায় খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা এমডিদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে পরিণত হয়েছে।