গাজীপুরের শ্রীপুরে সাফারি পার্ক থেকে দুটি রিং-টেইলড লেমুর চুরির ঘটনায় ভারতের বিখ্যাত বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্র 'বনতারা'র নাম জড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার বনতারার অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে তারা নিজদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত বনতারা হলো ভারতীয় শিল্পপতি মুকেশ আম্বানির ছোট ছেলে অনন্ত আম্বানির তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি বিশাল বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রায় সাড়ে তিন হাজার একর জমি জুড়ে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বখ্যাত।

বনতারার কর্তৃপক্ষ তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সাফারি পার্ক থেকে লেমুর চুরির খবর তারা অনুসরণ করছেন। তবে তারা স্পষ্ট করেন, বাংলাদেশের কোনো তদন্তকারী সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ থেকে তাদের কাছে কোনো নোটিশ বা আনুষ্ঠানিক অনুরোধ আসেনি। বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের সাথে বনতারার কোনো ধরনের যোগাযোগ বা লেনদেনের ইতিহাস নেই।

প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিটি প্রাণী ভারতীয় আইন মেনে এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক চাহিদা আসেনি, তবুও তারা দাবি করেন, তাদের কাছে থাকা রিং-টেইলড লেমুরগুলোর সম্পূর্ণ নথিপত্র প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে উপস্থাপনের জন্য তারা প্রস্তুত। এছাড়া, লেমুরগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ যাচাইয়ের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছে এবং আইনসম্মত যেকোনো সহযোগিতার কথা ঘোষণা করেছে।

অপরদিকে, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া ওই দুটি লেমুর ভারতে নিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল। তদন্তের সময় প্রাণী দুটির অবস্থান বনতারা শনাক্ত করার পর, সেগুলো বাংলাদেশ থেকে চুরি যাওয়া লেমুর কিনা তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রেক্ষিতে ডিএনএ প্রোফাইল চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গাজীপুর সাফারি পার্কে ওই দুটি লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকে সংরক্ষিত ছিল না, যা তদন্তে জটিলতা তৈরি করেছে।

বিষয়টি নিয়ে মুক্তকণ্ঠের সাথে কথা বলেন বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী। তিনি জানান, তাঁদের ডিএনএ প্রোফাইল সংগ্রহের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা রয়েছে এবং বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের ফরেনসিক ল্যাবও আছে। বিষয়টি সিআইডির সঙ্গে সমন্বয় করে খতিয়ে দেখার জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তাকে (ডিএফও) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এই খানও একই মত পোষণ করেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "সব প্রাণীর না হলেও মূল্যবান প্রাণীগুলোর অন্তত ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা উচিত। লেমুর দুটির ডিএনএ প্রোফাইল আগে থেকে থাকলে বর্তমানে প্রাণী দুটির পরিচয় নিশ্চিত করে দাবি প্রতিষ্ঠা করা সহজ হতো।"

বন্য প্রাণী চোরাচালান শনাক্ত এবং পাচার হওয়া প্রাণী দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। একই প্রজাতির অনেক প্রাণী থাকলেও নির্দিষ্ট কোনো প্রাণী কোথা থেকে এসেছে, তা শনাক্ত করতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখে।

গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকা লেমুরগুলো ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্য প্রাণীর সঙ্গে জব্দ করা হয়েছিল। পরে বন বিভাগের নির্দেশে সেগুলো সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। পার্কে থাকা লেমুরের মধ্যে ছানাও জন্ম নেয়। ২০২২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি লেমুর মারা যায়। এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বরে দুটি লেমুর চুরি হয়। এ ঘটনায় করা মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।