মহাসড়কের বাস ও ট্রাকের ভিড়ে হঠাৎ সামনে চলে আসা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পেছনে দ্রুতগতির বাস আর বিপরীত দিক থেকে ছুটে আসা অন্য একটি যান—কয়েক সেকেন্ডের জন্য তৈরি হওয়া এই ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন ময়মনসিংহের মহাসড়কগুলোতে নিয়মিত দৃশ্য। জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে যেসব যানবাহনের চলাচলের কথা নয়, সেসব অবৈধ যানই এখন প্রকাশ্যে রাজত্ব করছে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার, ইঞ্জিনচালিত ভ্যান ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা বাসের সামনে বা ট্রাকের পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটছে। এসব যানবাহনের অধিকাংশেরই ফিটনেস সনদ নেই এবং চালকদের অনেকেরই নেই বৈধ লাইসেন্স।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ময়মনসিংহ-শেরপুর আঞ্চলিক মহাসড়ক, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ পথে ছোট যানবাহনের অবাধ চলাচল লক্ষ্য করা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ছোট যান দ্রুতগতিতে বড় বাস ও ট্রাককে ওভারটেক করছে, আবার হঠাৎ মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে বা নামাচ্ছে, যার ফলে পেছন থেকে আসা বড় যানগুলোকে আকস্মিকভাবে গতি কমাতে হচ্ছে।

গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর আকুয়া বাইপাস মোড়ে একটি ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংঘর্ষে নারীসহ দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের একজন ফুলবাড়িয়া উপজেলার চৌদার গ্রামের ব্যবসায়ী সাদেক আলী। তিনি হাসপাতালে এক আত্মীয়কে দেখতে যাচ্ছিলেন। এই দুর্ঘটনায় আহত কয়েকজনের মধ্যে এক নারীর শিশুসন্তানের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ময়মনসিংহ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ময়মনসিংহে ১৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে, যাতে ১৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১৪১ জন আহত হয়েছেন। বিআরটিএ-র হিসাবে ময়মনসিংহে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৫ হাজার এবং মোটরসাইকেল ৭০ হাজার থাকলেও বাস্তবে অনুমোদিত সংখ্যার প্রায় তিন গুণ সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে চলছে। এছাড়া ৩৬০টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত বাসের মধ্যে প্রায় ২০০টি এবং প্রায় ৯০০টি ট্রাক ও পিকআপের বড় একটি অংশের ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেন নেই।

বাসচালক সামাদ মিয়া বলেন, "সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে যখন ছোট গাড়িগুলো হঠাৎ সামনে চলে আসে। বাসের গতি কমাতে সময় লাগে। সামনে অটোরিকশা থাকলে হর্ন দিলেও অনেক সময় সরতে চায় না। আবার সুযোগ পেলেই ওভারটেক করে। একটা ভুলের কারণে বাসের যাত্রীরা জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।"

ময়মনসিংহ-শেরপুর সড়কের বাসচালক মনির হোসেন বলেন, "অনেক থ্রি-হুইলার বা অটোরিকশার চালক মহাসড়কের নিয়ম ঠিকমতো জানেন না। তারা কখনো ডান দিক দিয়ে, কখনো বাম দিক দিয়ে চলে। যাত্রী নামানোর জন্য যেখানে-সেখানে গাড়ি থামান। পেছন থেকে বাস আসছে কি না, সেটাও অনেক সময় খেয়াল করেন না।"

দীর্ঘদিনের বাসচালক হারুন মিয়া জানান, এখন বড় গাড়ির পাশাপাশি ছোট গাড়িগুলোও দ্রুত চলতে চায় এবং যাত্রী ধরার জন্য পাশাপাশি চলে, যা বাস চালানো কঠিন করে তোলে। অন্যদিকে, অটোরিকশাচালক আজিজ মিয়া বলেন, "আমরা জানি মহাসড়কে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু দূরের যাত্রী পেলে ভাড়া ভালো পাওয়া যায়। সংসার চালাতে গিয়ে অনেক চালক বাধ্য হয়ে মহাসড়কে ওঠেন ও দ্রুতগতিতে গাড়ি চালান।"

আরেক চালক আব্দুল কাদির জানান, যাত্রীদের দ্রুত যাওয়ার চাপে অনেক সময় চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। চালক ফারুক মিয়া স্বীকার করেন, "কাগজপত্রের সমস্যা আছে—এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক গাড়ির ফিটনেস ঠিক নেই, অনেক চালকের লাইসেন্সও নেই। মাঝেমধ্যে পুলিশ মামলা দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে কাগজপত্র দেখতে চাইলে কিছু উৎকোচ দিলেই মামলা থেকে রেহাই পাওয়া যায়।"

যাত্রী সালমা খাতুন ও রফিকুল ইসলাম জানান, অটোরিকশার বেপরোয়া গতি এবং বাসের সাথে তাদের প্রতিযোগিতার কারণে যাত্রীদের মনে সবসময় আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

ময়মনসিংহ মঞ্চের সমন্বয়কারী ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, "পুলিশের অভিযান ও মামলার দাবি থাকলেও মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের উপস্থিতি কমছে না। বরং প্রতিদিনই এসব যানকে গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এখানে সমস্যাটি শুধু একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা একটি থ্রি-হুইলার মহাসড়কে উঠছে কি না, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চালকের যোগ্যতা, গাড়ির ফিটনেস, নিবন্ধন, গতি নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক আইন প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি। এসবের কোনো একটি জায়গায় দুর্বলতা থাকলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। সবগুলো জায়গায় দুর্বলতা থাকলে সেই ঝুঁকি ভয়াবহ আকার নেয়।"

নাগরিক সংগঠক ও কলেজ শিক্ষক মাসুম বিল্লাহ বলেন, "মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধ করতে হলে শুধু আটক বা মামলা দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ নেই। কোন সড়কে কোন ধরনের যান চলতে পারবে, অনুমোদিত যানবাহনের সংখ্যা কত, বাস্তবে কত চলছে, কার ফিটনেস নেই এবং কার লাইসেন্স নেই—এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে আইন ভঙ্গের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ থাকলে তারও তদন্ত প্রয়োজন। কারণ দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর কারণ খুঁজে বের করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ যানকে সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। ময়মনসিংহের মহাসড়কে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা সেটিই—আইন শুধু কাগজে থাকবে, নাকি তার বাস্তব প্রয়োগও দেখা যাবে।"

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ময়মনসিংহের সভাপতি আব্দুল কাদের চৌধুরী মুন্না চালকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। জেলা নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল বলেন, "সড়কে আইন প্রয়োগে কোনো ধরনের শিথিলতা থাকলে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন। অবৈধ যানবাহন বন্ধে প্রশাসন, পুলিশ, বিআরটিএ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে।"

বিআরটিএ ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান জানান, চালকদের সচেতনতা বাড়ানোর কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে, ময়মনসিংহের ট্রাফিক পরিদর্শক (প্রশাসন) গোলাম মওলা বলেন, "মহাসড়কে অবৈধ যানবাহনের চলাচল বন্ধে পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আইন অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অবৈধ যানবাহনের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।"