নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালকে (৩২) এখনো দাফন কিংবা দাহ করা হয়নি। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা–বাবার মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় মারা যাওয়ার ছয় দিন পরও তাঁর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে আছে।
হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করা শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করতে চান মা, স্ত্রী ও ভাই। কিন্তু বাবা চান হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য করতে। শুভর মৃত্যুর পরপরই মা ও স্ত্রী দাফন করতে চাইলে বাধা দেন বাবা। দাফন কিংবা দাহকাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে স্ত্রীর পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে রিট করা হয়। পরে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসলামি রীতিতে দাফনের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দাফন নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে মতভেদ তৈরি হয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। মা ও ভাই উচ্চ আদালতে আবেদন করলে ইসলামি রীতিতে লাশ দাফনের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে তিন সন্তানকে (দুই ছেলে ও এক মেয়ে) নিয়ে পার্বতী রানী হিন্দুধর্ম থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর নাম হয় আয়েশা বেগম। দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভর নতুন নাম রাখা হয় মো. বিল্লাল এবং তাঁর ছোট ভাই সুজনের নাম হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) শুভ চন্দ্র দাস নাম পরিবর্তন করা হয়নি।
শুভর ভাই ইব্রাহিম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ধর্মান্তরের পর থেকেই তাঁরা মুসলিম পরিচয়ে জীবনযাপন করে আসছেন। ছোটবেলায় শুভ মাদ্রাসায় পড়েছেন। এখন বাবা হিন্দুধর্মের অনুসারী দাবি করে মরদেহ দাফনে বাধা দিচ্ছেন।
শুভ মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। প্রায় আট বছর আগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি মুসলিম তরুণী জ্যোতি আক্তারকে বিয়ে করেন। কাবিননামার মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে সুমাইয়া আক্তার নামে দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। তাঁরা নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর স্বামী জীবিত থাকতে বলে গেছেন, মারা গেলে মুসলিম রীতি অনুযায়ী দাফন করতে। কিন্তু তাঁর শ্বশুর পুলিশ পাঠিয়ে মাসদাইর কবরস্থান থেকে মরদেহ নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মরে গিয়েও শান্তি পাইতাছে না। ওনারা তাকে কষ্ট দিতাছে। আমরা চাই, ইসলাম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দাফন করা হোক।’
তবে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের অবস্থান ভিন্ন। তাঁর দাবি, শুভ হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন। তাই হিন্দু ধর্মীয় রীতিতেই তিনি ছেলের শেষকৃত্য করতে চান।
পরিবারের তথ্যমতে, শুভর জাতীয় পরিচয়পত্রে তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়নি। তাঁর বাবা নিজে জাতীয় পরিচয়পত্রে সৎমায়ের নাম ব্যবহার করেছেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। মরদেহ নিয়ে বিরোধ শুরু হওয়ার পর প্রথমে শুভর মরদেহ নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অ্যাম্বুলেন্সের ফ্রিজে রাখা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শুভর মায়ের আবেদনের পর মরদেহ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শুভর বাবা আইনজীবীর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের জন্য মরদেহ চেয়ে আবেদন করেন। হস্তান্তরের আগপর্যন্ত মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে রাখার আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। তিনি বলেন, শুভর মা ও ভাই উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ শুভকে ইসলাম ধর্মীয় রীতিতে দাফন করার আদেশ দেন।
রিটকারী আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদেশ হওয়ায় আদেশের কপি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোববার কার্যদিবসের শুরুতেই আদেশের কপি পৌঁছানোর আশা করছেন।
শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী তাঁরা শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফন করবেন। রোববার আদেশের কপি পাওয়ার পর শহরের মাসদাইরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে শুভর হত্যাকাণ্ডের তদন্তও চলছে। ৫ সেপ্টেম্বর শুভর গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থল থেকে ৫টি গুলির খোসা ও ১০০টি ইয়াবা উদ্ধার করেছিল পুলিশ। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, ইয়াবার বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাঁকে ঘটনাস্থলে ডেকে আনা হয়েছিল। সেখানে ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাঁকে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র কোপায়। পরে রিমান্ডে থাকা এক আসামির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন জব্দ করা হয়।