দেশের অন্যতম প্রধান চালের মোকাম নওগাঁয় ধান ও চালের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এক থেকে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন ধরনের চালের দাম কেজিপ্রতি এক থেকে দুই টাকা এবং আউশ ধানের দাম মণপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত নেমে এসেছে। ভোক্তাদের জন্য এই দাম কমানো স্বস্তির কারণ হলেও, কৃষকদের জন্য এটি হতাশার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, মোকামে পাইকারি বেচাকেনা কমে যাওয়ায় গুদামে চালের মজুত বাড়ছে। স্থানীয় চাহিদা কমে যাওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের কাছে 'পুশিং সেল বা অনুরোধে বিক্রি' চলছে, যা দাম কমাতে বাধ্য করছে।
জেলা চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন চকদার বলেন, "গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল আমদানি করা হয়। এ কারণে দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল মজুত রয়েছে। মজুত চালের কারণে মোকামে চাহিদা কমে গেছে। তাতে গত তিন-চার বছরের তুলনায় এ বছর ধান-চালের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। চালের চাহিদা না থাকায় মিলমালিকেরা ধান কেনাও কমিয়ে দিয়েছেন। এ কারণে বাজারে আউশ ধানের দামও কমে গেছে। কৃষকেরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান, সে জন্য আউশ মৌসুমেও সরকারের চাল বা ধান কেনা উচিত। সরকারের সঠিক উদ্যোগই পারে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে।"
বাজারে বর্তমানে আউশ ধান (পারিজা ও ব্রি ধান-৪৮) প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা। গত বছরের একই সময়ে এই ধানের দাম ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০ টাকা। কাটারি ধান বর্তমানে মণপ্রতি ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যেখানে গত বছর এ সময়ে দাম ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা। জিরা ধানের দাম এখন মণপ্রতি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে জিরা ধানের দাম, মণপ্রতি সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা।
চালের দামও কমেছে। বর্তমানে পাইকারিতে জিরা চাল কেজিপ্রতি ৫৬ থেকে ৬১ টাকা এবং কাটারি চাল ৭৩ থেকে ৭৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে এই দামে প্রায় দুই টাকা কমেছে। আরেক মাস আগে তুলনায় এই দুই ধরনের চালের দাম তিন থেকে পাঁচ টাকা পর্যন্ত কমেছে। মোটা চাল হিসেবে পরিচিত স্বর্ণা চাল বর্তমানে কেজিপ্রতি ৪২ থেকে ৪৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগে ছিল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা।
এদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চালের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিলমালিকদের সতর্ক করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. ফরহাদ খোন্দকার উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, "অভিযোগ আছে চালে কৃত্রিমভাবে সুগন্ধি মেশানো হয়। কোনোভাবেই এ ধরনের প্রতারণা করা যাবে না। একই সঙ্গে চাল সাদা করার জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ‘হাইড্রোজ’ ব্যবহার না করার জন্যও মিলমালিকদের তিনি নির্দেশ দেন।"
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ফরহাদ খোন্দকার বলেন, "বর্তমানে দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ফলে আগামী তিন মাসে চালের দাম বাড়ার কোনো আশঙ্কা নেই। কোনো ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুত গড়ে তুলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, চালের বাজার স্থিতিশীল থাকলেও ধানের দাম কমে যাওয়ায় কৃষকেরা কীভাবে উৎপাদন খরচ তুলবেন, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কৃষকেরা যাতে ধানের ন্যায্য দাম পান, সে জন্য আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে চাল কেনার পাশাপাশি ধান থেকে বায়োফুয়েল উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।"