মাদারীপুরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সাংগঠনিক কাঠামো গুছাতে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছে। তবে এই কমিটির শীর্ষ দুই পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাস এবং দল পরিবর্তনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যাপক সমালোচনা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। বলা হচ্ছে, নতুন দলের নেতৃত্বে আসার পেছনে তাদের রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে সময়ের বাস্তবতা বেশি প্রভাব ফেলেছে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এনসিপির ঘোষিত কমিটিতে মাদারীপুর জেলার আহ্বায়ক করা হয় মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়াকে। অন্যদিকে, সদস্যসচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, মনিরুল ইসলাম একসময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি দল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। আর ইয়াজ্জেম হোসেন রোমান দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং একপর্যায়ে শিবচর উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

প্রশ্ন উঠছে, একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠন গড়তে পুরোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং দল পরিবর্তনকারী ব্যক্তিদের ওপর কেন নির্ভর করা হলো। বিশেষ করে অতীতে বিতর্কিত অবস্থান নিয়ে থাকা একজন ব্যক্তিকে জেলার শীর্ষ পদে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মহলে নানা আলোচনা চলছে।

মনিরুল ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। তিনি মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। সূত্রগুলোর দাবি, ২০১১ সালে তিনি সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি ভোল পাল্টে সেই দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাসিমের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এছাড়া, বাহাউদ্দিন নাসিমের ছোট ভাই ও মাদারীপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র খালিদ হোসেন ইয়াদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেও তার পরিচয় রয়েছে। বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হওয়া এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে এসব রাজনৈতিক সম্পর্ক তাকে সুবিধাজনক পথ তৈরি করেছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।

ফোনে মুক্তকণ্ঠকে মনিরুল ইসলাম বলেন, "আমরা মূলত বিএনপি পরিবার। আমার বাবা নেতা ছিলেন। সেই সুবাদে আমরা বিএনপির সঙ্গে লেগে আছি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আমাদেরকে সেভাবে কোনো মূল্যায়ন করেনি। তাই নতুনদের দলে নতুনদের নিয়ে এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।"

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আওয়ামী লীগের কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।"

অন্যদিকে, এনসিপির জেলা সদস্যসচিব হিসেবে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানকে নিয়েও সমালোচনা চলছে। সূত্র জানায়, বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকার পর তাকে জেলা কমিটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বিএনপির সাবেক নেতাকে এনসিপির নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দলটি কী ধরনের যাচাই-বাছাই করেছে।

শিবচর উপজেলা বিএনপির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "রোমান বিএনপিতে থাকা অবস্থায় নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। এ কারণে তিনি বিভিন্ন স্থানে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় তার এই অবস্থা। রোমান একজন সুবিধাবাদী লোক। যেখানে সুবিধা পাবেন, সেখানে তিনি প্রবেশ করার চেষ্টা করেন।"

বিষয়টি নিয়ে ইয়াজ্জেম হোসেন রোমানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

মাদারীপুরে এনসিপির কমিটিতে পুরোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ‘নতুন রাজনীতি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন স্থানীয় রাজনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করে বলেন, "কোনো ব্যক্তি আগে অন্য রাজনৈতিক দল করলে নতুন দলে আসতে পারবেন না—এমন কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু নতুন দল যখন পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের কথা বলে, তখন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।"

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মনিরুল ইসলাম দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিলেন। তাকে এনসিপির জেলা আহ্বায়ক করা হওয়ায় সবাই বিস্মিত। তারা আরও জানান, "আওয়ামী লীগ একজন সুবিধাবাদী লোক। তিনি ক্ষমতাশালী দলের সুবিধা নেওয়ার জন্য দল পাল্টান। ত্রিমুখী সাপ—এদের কোনো দলে না নেওয়া ভালো।"

সার্বিক বিষয়ে এনসিপির মাদারীপুর জেলা কমিটির যুগ্ম সমন্বয়কারী মো. হাসিবুল্লাহি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "মনিরুল ইসলাম আওয়ামী লীগের প্রেতাত্মা। তার আজীবন সংগ্রাম ছিল আওয়ামী লীগের জন্য। তিনি অভ্যুত্থানবিরোধী ছিলেন। জেলায় কীভাবে একজন আওয়ামী লীগের অনুসারীকে এনসিপির নেতা বানানো হলো–এটা জেনে আমরা বিস্মিত। দলের জন্য কাজ করলাম আমরা, নেতা হলো কে…।"