পদ্মা নদীর পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) লোকালয়ে পানি প্রবেশ করায় দুই ইউনিয়নে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। পানির উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীভাঙন এবং বিষধর সাপের আতঙ্কে এলাকাবাসী দিন কাটাচ্ছেন।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে উপজেলা প্রশাসন রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারী ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান নিরুৎসাহিত করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও পদ্মার পানি বৃদ্ধির কারণে বৃহস্পতিবার থেকে এই দুই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও নিচু অংশের স্থাপনাগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোর ওপরও। চিলমারী ইউনিয়নের পদ্মা নদীর তীরবর্তী সীমান্তঘেঁষা উদয়নগর, আতারপাড়া ও ডিগ্রীরচর এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও যোগাযোগের সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

পানি বাড়ার সাথে সাথে প্লাবিত এলাকায় সাপের আতঙ্ক বেড়েছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ঝোপঝাড়, গর্ত ও নিচু জায়গা থেকে সাপগুলো শুকনো ও উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও গবাদিপশু নিয়ে পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় রয়েছে। রাতের বেলায় পানির মধ্যে চলাচল করতে গিয়ে সাপের কামড়ের আশঙ্কায় অনেকে ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানান, বাড়ার পর ঘরবাড়ির চারপাশ ডুবে গেছে। এখন আবার সাপের ভয়। রাতে ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাচ্চাদের নিয়ে বেশি চিন্তায় আছি।”

তারা আরও বলেন, পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি খারাপ হবে। ঘরবাড়িতে পানি উঠলে মানুষ শুকনো জায়গায় উঠবে। তখন সাপের ভয়ও বাড়বে।

এদিকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধির বিষয়টি নদীর পানি পরিমাপের তথ্যেও নিশ্চিত হয়েছে। ১০ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে ১২ দশমিক ৯৮ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। আগের দিন ৯ সেপ্টেম্বর পানি ছিল ১২ দশমিক ৯০ মিটার। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে পানি বেড়েছে ৮ সেন্টিমিটার। এই পানি বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দৌলতপুরের পদ্মাতীরবর্তী চর ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে তীব্র স্রোতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে। পাশের পাবনা রাজবাড়ী নৌপথে পদ্মার প্রবল স্রোতের কারণে ফেরি চলাচলেও বিঘ্ন ঘটেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকদিন ধরে পদ্মায় প্রতিদিনই পানি বাড়ছে। এর আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের পদ্মার চরাঞ্চলের ৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়। গত তিন দিনে পদ্মায় ৩৭ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধির কথা জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, হঠাৎ করে পানি বাড়তে শুরু করেছে। বাড়ির চারপাশে পানি, চলাচলও কঠিন হয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, সেই চিন্তায় আছি।

আরেক বাসিন্দা মোজাম বলেন, আমাদের এলাকায় প্রতিবছরই পানির ভয় থাকে। এবার পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে নদীভাঙনের আশঙ্কাও করছি। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

পানিবন্দি মানুষেরা বলছেন, পানি বাড়ার কারণে শিশুদের স্কুলে পাঠানো নিয়ে চিন্তায় আছি। বাড়িঘরে পানি ঢুকে গেলে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সমস্যাও তৈরি হবে।

চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে গত দুই-তিন দিনে ইউনিয়নের ১৯টি গ্রামের মধ্যে ১৭টির নিম্নাঞ্চলের ঘর বাড়িতে পানির উঠে গেছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। স্কুলগুলোতে পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। পানি ওঠার পর থেকে বিষধর সাপের উপদ্রবও বেড়েছে। ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের কে চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল বলেন, আমার ১-ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের

রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আমার ইউনিয়নের প্রতিটি গ্রামের চারপাশে এখন পানি। সড়কগুলো ডুবে যাওয়ায় স্বাভাবিক চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক বাড়ির ভেতরে পানি না ঢুকলেও ভিটা পর্যন্ত পানি উঠে এসেছে।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ইতোমধ্যে প্লাবিত এলাকার ৩০০ পরিবারের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন পুরো পরিস্থিতি নজরে রেখেছে। প্লাবিত এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্লাবিত দুই ইউনিয়নের ১৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।