মুঠোফোনের ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য কেনাবেচাকে ঘিরে অনলাইনে একটি কালোবাজার গড়ে উঠেছে। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন প্রচার, স্বতন্ত্র ওয়েবসাইট স্থাপন এবং টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এই অবৈধ লেনদেন চলছে। টাকা প্রদান করলেই নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল ডাটা রেকর্ড (সিডিআর), মুঠোফোনের অবস্থান, এসএমএস, টিআইএন সনদ, পাসপোর্টের তথ্য এবং আর্থিক লেনদেনের বিবরণী সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যগত নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রি করা সংক্রান্ত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে ৬০০টির বেশি পোস্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, মন্ত্রী ও এমপি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তথ্যও নিরাপদ নয়। এমনকি যাদের দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের গোপন তথ্যও ফাঁস হচ্ছে।

ডিজিটাল রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বিষয়টি নিয়ে বলেন, "মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ তার একান্ত গোপনীয় তথ্য। সেটা যখন হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। ধরা যাক কোনো অপরাধী চক্র কারও ক্ষতি করতে চায়। তাহলে মুঠোফোনের সিডিআর কিনে তিনি কোথায় কোথায় যান, সে সম্পর্কে আঁচ করতে পারে।"

যেসব ওয়েবসাইটে সিডিআর বিক্রি হয়, সেখানে এনআইডি ক্রিয়েট, স্মার্ট এনআইডি ক্রিয়েট, জন্মনিবন্ধন ক্রিয়েট, অটো সাইন কপি, বায়োমেট্রিক অর্ডার, লোকেশন অর্ডার, কললিস্ট অর্ডার, মোবাইলে আর্থিক সেবা অ্যাপের অর্ডার এবং পাসপোর্টের এসবি কপি বিক্রির মতো বিজ্ঞাপন রয়েছে। প্রতিটি সেবার জন্য আলাদা ফি ও সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, তিন মাসের সিডিআরের দাম ১ হাজার ৫০ টাকা, আর ছয় মাসের সিডিআরের দাম ১ হাজার ২০০ টাকা। এই ওয়েবসাইটগুলো পরিচালনাকারীরা ক্রেতাদের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন।

এই বিষয়ে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানান, "নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য এভাবে বিক্রি হওয়া, ফাঁস হওয়া চলতে দেওয়া যায় না। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এই চক্রকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে সরকার কাজ করছে।"

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী জানান, "নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য যদি এভাবে বিক্রি হয়, সেটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে মিলে বিটিআরসি কাজ করছে।"

দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর গ্রাহক সংখ্যা ১৯ কোটির কিছু বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ (২০২২) জনশুমারি ও গৃহগণনার তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ৫৬ শতাংশ মানুষ মুঠোফোন ব্যবহার করেন। অপারেটরগুলো আইনগতভাবে নাগরিকদের কল, এসএমএস, আইএমইআই এবং টাওয়ারের তথ্য সংরক্ষণ করে। তবে সিডিআরে হোয়াটসঅ্যাপ, সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো অ্যাপের তথ্য পাওয়া যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ ১২টি সংস্থা এই ডেটাবেস ব্যবহারের সুযোগ পায়।

টেকগ্লোবাল ইনস্টিটিউটের (টিজিআই) গত মাসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৮টি তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৩৬টি সরকারি ও ৩২টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ফাঁস হয়েছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "এ ধরনের তথ্য বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে কারা এতে জড়িত, তা শনাক্ত করা উচিত। একই সঙ্গে তথ্য ফাঁসের সুযোগ তৈরি করা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগতভাবে তা সংশোধন করতে হবে।"

সূত্র: মুক্তকণ্ঠ