একসময় ডেঙ্গু কেবল বর্ষাতেই হতো। এখন মৌসুমের বিচার নেই। শরৎ এসে গেল, হেমন্তও দোরগোড়ায়, অথচ ডেঙ্গু সংক্রমণ এখনো বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ১ জানুয়ারি থেকে ৮ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গতকাল মারা গেছে ৯ জন, যা এই মৌসুমে এক দিনে সর্বোচ্চ। এই মৌসুমে মোট ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ১৩০ জনের মধ্যে ১৬ জনই শিশু, যাদের বয়স ১৫ বছরের মধ্যে।

ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। এই সময় শিশুর জ্বর হলেই মনে ভর করছে চাপা দুশ্চিন্তা, ডেঙ্গু নয় তো? তার মধ্যে আবার যেসব শিশুর আগেও ডেঙ্গু হয়েছে, তাদের নিয়ে আরও ভয়।

আর দশটা সংক্রমণের মতো ডেঙ্গুতেও তীব্র মাত্রার জ্বর হয়। কিন্তু এ রোগের বিশেষত্ব হলো জ্বর শুরু হওয়ার তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে জ্বর কমে যায়। জ্বর কমার পরপরই শুরু হয় আসল জটিলতা। এই সময় প্লাজমা লিকেজ হয়।

রোগীর রক্তনালি থেকে রক্তের জলীয় অংশ বা প্লাজমা বেরিয়ে আসাকে বলে প্লাজমা লিকেজ। এই বেরিয়ে আসা প্লাজমা ফুসফুসের চারপাশ ও পেটের ভেতরে জমে থাকে। ফলে রক্তনালির ভেতরে থাকা রক্তের পরিমাণ যেমন কমে যায়, তেমনি কমে যায় রক্তচাপ। রক্তচাপ কমতে কমতে অনেক সময় শকে চলে যায় রোগী। উপরন্তু, এই প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়ায় রোগীর রক্ত ঘন হয়ে যায়।

শরীরের অনেক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বঞ্চিত হয় প্রাপ্য রক্ত সরবরাহ থেকে। ফলে অরগান ফেইলিউর বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে থাকে। এই সময়েই অনেক রোগীর রক্তের প্লেটলেট কমে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে। সামগ্রিকভাবে ডেঙ্গুর এই অবস্থাকে বলা হয় ক্রিটিক্যাল ফেজ।

আর দশটা ভাইরাসজনিত রোগের সঙ্গে এখানেই ডেঙ্গুর পার্থক্য। কারণ, জ্বরের পরই শুরু হয় এই বিভীষিকা। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুর জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে, এমন ভেবে নিশ্চিন্তে থাকা একদম ঠিক নয়। সুস্থ হয়ে ওঠার সময়টুকুতেও সতর্ক থাকতে হবে।

ঠিক নির্দিষ্ট একটা কারণের মধ্যে এর উত্তর সীমাবদ্ধ নেই। তবে নিচের কারণগুলো বিবেচনায় আনা যায়—

আগের ডেঙ্গু সংক্রমণের পর দ্বিতীয়বার সংক্রমণ, বিশেষ করে ডেঙ্গু ভাইরাসের ভিন্ন সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে বাড়তে পারে মারাত্মক ডেঙ্গুর ঝুঁকি।

আক্রান্ত শিশুকে দেরিতে হাসপাতালে নিয়ে গেলে খারাপ হতে পারে অবস্থা।

ছোট বয়সের শিশুদের ঝুঁকি খুবই বেশি। তাদের শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নাজুক থাকায় শরীরে দ্রুত প্রদাহ সৃষ্টির সুযোগ পায় ডেঙ্গু ভাইরাস।

শিশুদের শরীরের রক্তনালিগুলো একটু দুর্বল ও ভঙ্গুর থাকায় প্রদাহের সঙ্গে সঙ্গেই প্লাজমা লিকেজ শুরু হয়ে শক ঘটানোর সুযোগ পায়।

এ ছাড়া তাদের শরীরের আকৃতিও ছোট থাকায় শরীর থেকে অল্প প্লাজমা লিকেজেই দ্রুত রক্তচাপ কমে যায়। কমে যায় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে রক্ত সরবরাহ।

আক্রান্ত শিশুর যদি—

পেটব্যথা হয় বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা পায়।

বারবার বমি হতে থাকে। বমির সঙ্গে রক্ত আসে।

শরীরের কোনো জায়গায় রক্তপাতের চিহ্ন দেখা গেলে।

পায়খানার রং আলকাতরার মতো কালো হলে।

শিশু যদি অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক আচরণ করে।

অনেক দুর্বল অনুভব করলে আর অস্বাভাবিক ঘুমালে।

শিশুর হাত-পা ঠান্ডা মনে হলে।

লম্বা সময় ধরে প্রস্রাব না করলে।

শ্বাস দ্রুত হচ্ছে বা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে মনে হলে।

মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা দেখলে।

খেতে বা পান করতে না পারলে।

হঠাৎ আচরণ বা চেতনার পরিবর্তন দেখা দিলে।

পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাতে না যেতে পারে, তার জন্য মা-বাবারা যা করবেন—

জ্বরের কততম দিন চলছে, রোজ তা লিখে রাখবেন।

জ্বরের শুরু থেকেই শিশুকে খাবার স্যালাইনসহ বেশি বেশি তরল খাবার দেবেন, অল্প অল্প করে বারবার।

অন্যান্য দিনের মতো ঘরের স্বাভাবিক খাবারও দিন, তবে ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফলমূল বেশি দিলে ভালো।

প্রস্রাবের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখবেন।

জ্বর কমলেই নিশ্চিন্ত না হয়ে এ সময় বেশি করে খেয়াল করবেন। অনেকে জ্বর কমার সঙ্গে সঙ্গেই স্কুলে পাঠিয়ে দেন, এমনটা করবেন না। শিশুকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখুন।

জ্বর দ্রুত কমানোর জন্য অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রফেন জাতীয় ওষুধ কখনো দেবেন না।

আগে ডেঙ্গু হয়ে থাকলে ডাক্তারকে সেটা অবশ্যই জানাবেন এবং বিশেষভাবে সতর্ক থাকবেন।

যেহেতু নিয়মিত ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাচ্ছে, তাই আগের মতো সব উপসর্গ না–ও থাকতে পারে। আবার পরীক্ষায় সব সময় পজিটিভ না-ও আসতে পারে। তাই যেকোনো জ্বর হলেই সতর্ক অবস্থায় থাকুন।

শুধু রক্তের প্লেটলেট দেখে শিশুর অবস্থা বিচার না করে শিশুর সামগ্রিক অবস্থা দেখে ও বুঝে ব্যবস্থা নেবেন। সম্ভব হলে বাড়িতে রক্তচাপ মনিটর করার ব্যবস্থা রাখুন।

লেখক: শিশুবিশেষজ্ঞ, বারডেম হাসপাতাল, ঢাকা