খুলনার বটিয়াঘাটা ও ডুমুরিয়া উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া শোলমারী নদীটি একসময় ছিল অঞ্চলটির প্রাণশক্তি। নৌযান চলাচল, কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশন—সবকিছুই নির্ভর করত এই নদীর ওপর। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই খরস্রোতা নদী আজ প্রায় মৃত। পলি জমে, দখল আর অপরিকল্পিত বাঁধ-স্লুইস গেটের কারণে নদীটি সংকুচিত হয়ে এখন অনেক জায়গায় নালায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় নদীটির প্রস্থ ছিল প্রায় ১৫০ মিটার। এখন অনেক অংশে তা মাত্র ৩ থেকে ৪ মিটার। ভাটার সময় তো বটেই, এমনকি জোয়ারের সময়ও নৌকা চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো স্থানে তো মানুষ হেঁটেই নদী পার হয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা আল আমিন গোলদার বলেন, "কৃষিতে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ধান লাগানোর পরপরই বন্যার পানি ঢুকে ধান নষ্ট হয়ে যায়। বছরের একটি ফসলও ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারছি না।"
একই কথা বলেন নদীপাড়ের বাসিন্দা তুরান হোসেন। তিনি বলেন, "একসময় শোলমারী নদী ছিল খরস্রোতা ও গভীর। সারা বছরই নদীতে পানির প্রবাহ ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ও অবকাঠামোর কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে নাব্যতা কমে নদীটি সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এতে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশনসহ পুরো এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।"
নদীটি মরে যাওয়ায় কৃষিতে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, "নদী ও খালগুলো মরে যাওয়ার কারণে প্রায় ১ হাজার ৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ কমেছে। অন্যান্য সমস্যার মধ্যে রয়েছে, পেঁপে, মরিচ ও চুইঝালের গাছ পানি জমে যাওয়ার কারণে সহজেই মারা যাচ্ছে।"
শুধু কৃষিই নয়, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। শোলমারীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও জলাশয়ে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় অতিরিক্ত পানি দ্রুত নদীতে নামতে পারছে না। ফলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে। মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে।
এ অবস্থায় নদীটি বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার নদী খননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। খুলনা পানি উন্নয়ন বিভাগ-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (পুর) মো. আতিকুর রহমান বলেন, "শোলমারী নদীর সমস্যা সমাধানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার নদী খনন করা হবে।"
তবে প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র চার কিলোমিটার খননেই কি শোলমারীর দীর্ঘদিনের সংকটের সমাধান হবে? পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর তলদেশ থেকে পলি সরানো প্রয়োজন, কিন্তু শুধু খনন করে নদীকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. আবদুল্লাহ ইউসুফ আল হারুন বলেন, "একটি নদীর নাব্যতা কমে গেলে শুধু নদীই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে কৃষিজমি, খাল ও জলাশয়ের ওপরও। নদীর নাব্যতার ওপর পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহ ব্যবস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই অল্প পরিসরে নদী খনন করে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নদীর পানি স্বাভাবিকভাবে সমুদ্রে গিয়ে পড়ার পথও নিশ্চিত করতে হবে।"
তিনি আরও বলেন, "খনন কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নয়। বিভিন্ন জায়গায় অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা স্লুইস গেট ও বাঁধের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং পার্শ্ববর্তী খাল-জলাশয়ে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলেই নদীকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।"
বিশেষজ্ঞদের মতে, শোলমারীর সংকট শুধু পলি জমার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদীর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-জলাশয়ের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ-স্লুইস গেট এবং দীর্ঘদিনের রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিও সংকটকে জটিল করেছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায়।
এখন দেখার বিষয়, শোলমারী থেকে রামদিয়া পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়। কারণ খননের পর আবার পলি জমে নদী ভরাট হলে কিংবা পানিপ্রবাহের পথে থাকা দখল ও অপরিকল্পিত বাঁধ-স্লুইস গেটের সমস্যা থেকে গেলে নদী খননের সুফল দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।