২০১৯ সালের গ্রীষ্মে প্রিয় ক্লাবের ম্যাচ দেখে স্টেডিয়াম থেকে বের হচ্ছিলেন স্টেফান আর (ছদ্মনাম)। হঠাৎ কালো পোশাকের এক ব্যক্তি তার হাত চেপে ধরেন। পেছন থেকে এসে ঘিরে ফেলেন আরও অন্তত দুজন। এরপর হুমকি, ‘ওই পতাকা আবার দেখলে গুলি করব।’

স্টেফানের ‘অপরাধ’ ছিল বৈচিত্র্য ও সহনশীলতার পক্ষে একটি ব্যানার টাঙানো। জার্মান কাপের ম্যাচে হামবুর্গের বিপক্ষে খেলছিল তার প্রিয় ক্লাব কেমনিৎসার এফসি। গ্যালারিতে টাঙানো ব্যানারে রংধনুর রঙে লেখা ছিল উদারতা ও সহাবস্থানের বার্তা। সেটিই ক্ষুব্ধ করেছিল একই ক্লাবের উগ্র ডানপন্থি কয়েকজন সমর্থককে।

নিরাপত্তার কারণে নাম বদলে স্টেফানের এই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছে দ্য অ্যাথলেটিক। ২০২৪ সালে প্রথম প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) হালনাগাদ করেছে সংবাদমাধ্যমটি। জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থিদের নির্বাচনী সাফল্যের প্রেক্ষাপটে ফুটবলের গ্যালারিতে তাদের প্রভাবের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

রোববার সাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে প্রায় ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে উগ্র ডানপন্থি দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি। সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি দলটি। এই ফল জার্মানিতে উগ্র ডানপন্থার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

স্টেফান একসময় এমন একটি সমর্থকগোষ্ঠীতে ছিলেন, যারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলত। তবে কয়েকজন সদস্যের ইসলামবিদ্বেষী ও শরণার্থীবিরোধী মনোভাব তাকে অস্বস্তিতে ফেলে। পরে তিনি বৈচিত্র্যের পক্ষে আলাদা একটি গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। তার ভাষায়, তখনই উগ্রপন্থিরা বুঝতে পারে তারা কী করতে চাইছেন।

২০২৪ সালে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্টেফানের অনুমান ছিল, ক্লাবের উগ্রপন্থি সমর্থকদের সংখ্যা ৫০ জনেরও কম। কিন্তু ভয় দেখানোর ক্ষমতা ও প্রভাব এত বেশি যে অন্য সমর্থক, এমনকি ক্লাব পরিচালনায় যুক্ত ব্যক্তিরাও তাদের বিরোধিতা করতে ভয় পান।

কেমনিৎসারের মাঠে এমন প্রভাবের নজিরও রয়েছে। ২০১৯ সালে প্রকাশ্যে নিজেকে নব্যনাৎসি হিসেবে পরিচয় দেওয়া থোমাস হালারের মৃত্যুর পর স্টেডিয়ামে তাকে স্মরণ করা হয়। কালো পোশাকে সমর্থকদের উপস্থিতির পাশাপাশি শ্রদ্ধা জানান মাঠের ঘোষকও। হালারের প্রতিষ্ঠিত সমর্থকগোষ্ঠীসহ দুটি উগ্রপন্থি গোষ্ঠীকে অবশ্য ২০০৭ সালেই নিষিদ্ধ করেছিল ক্লাব।

স্টেফানকে হুমকি দেওয়ার পর ক্লাবের বর্ণবাদবিরোধী কর্মকর্তা তাকে সহায়তার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ডের স্পিগেলকে দেওয়া বক্তব্যে ক্লাবের এক মুখপাত্র ঘটনাটিকে রাজনৈতিক মতভেদ বা অতিরিক্ত মদ্যপানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। পুলিশের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছিল, স্টেফানের বিবরণে অসংগতির কথা তাদের জানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধও রয়েছে জার্মান ফুটবলে। এসভি বাবেলসবের্গ শরণার্থীদের নিয়ে দল গড়েছে, সমকামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে এবং অটিজম আছে এমন খেলোয়াড়দের জন্যও ফুটবলের সুযোগ তৈরি করেছে। ক্লাবের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বারবারা পেখের ভাষায়, ‘আমরা গণতান্ত্রিক, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী।’

বার্লিনের তুর্কি সম্প্রদায়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠা ক্লাব তুর্কিয়েমস্পোরের অভিজ্ঞতাও কঠিন। ক্লাবটির কর্মকর্তা মুরাত দোগান স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন, খেলোয়াড় থাকা অবস্থায় প্রতিপক্ষের মাঠে তাদের দিকে পাথর ছোড়া হতো। একবার তার দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল শূকরের মাথাও। নিরাপত্তাহীনতায় ধীরে ধীরে মাঠে আসা কমিয়ে দেন সমর্থকেরা।

স্টেফানের ভয়ও কাটেনি। তবু প্রিয় ক্লাব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চান না। মাঠে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি, বাড়িতে বসে থাকলে ওরাই জিতে যাবে।’