ভোলা সদর উপজেলার চরসামাইয়া ইউনিয়নে অবস্থিত বন্ধুজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে জরাজীর্ণ ভবন ও টিনশেড ঘরে প্রায় ৫৮৮ শিক্ষার্থীর পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো আধুনিক একাডেমিক ভবন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

২০০৫ সালে নির্মিত দোতলা ভবনের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে আসায় এবং ছাদে ফাটল দেখা দিয়েছে। দরজা-জানালার অবস্থাও নাজুক। অন্যদিকে, টিনশেড শ্রেণিকক্ষের ফুটো চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও বেঞ্চ ভিজে যায়। বিদ্যালয়ে নেই বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, ছাত্রীদের কমনরুম ও সীমানাপ্রাচীর। বর্ষায় জলাবদ্ধতায় মাঠ ও প্রবেশপথ ডুবে যায়। তীব্র গরমে পর্যাপ্ত ফ্যান না থাকায় শ্রেণিকক্ষে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি হয়।

৫৮৮ শিক্ষার্থীর জন্য বেঞ্চ রয়েছে মাত্র ১১০টি। ফলে একটি বেঞ্চে পাঁচ থেকে ছয়জন শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে বসতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদেরও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ে বর্তমানে মাত্র একটি শৌচাগার রয়েছে, যা ৩২৯ জন ছাত্রী ও নারী শিক্ষককে ব্যবহার করতে হয়। পুরুষ শিক্ষক ও ছাত্রদের শৌচাগারের জন্য আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। শিক্ষকদের জন্য পৃথক শৌচাগার নির্মাণে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও পরে সেই বরাদ্দ বাতিল হয়ে যায়।

দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহবুবা আক্তার ফাতেমা বলে, "মেয়েদের জন্য মাত্র একটি টয়লেট। সেখানে ঢুকতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। সাবান বা হাত ধোয়ার আধুনিক ব্যবস্থাও নেই। কমনরুম না থাকায় ছাত্রীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়।" অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মুহাম্মদ আবি আব্দুল্লাহ আহাদ বলে, "শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফ্যান নেই। প্রচণ্ড গরমে টিনের চালের নিচে দমবন্ধ পরিবেশে ক্লাস করতে হয়। তার ওপর বেঞ্চের সংকট থাকায় গাদাগাদি করে বসতে হয়।"

শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে গ্রুপভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস কখনো প্রধান শিক্ষকের কক্ষে, কখনো লাইব্রেরি, বারান্দা কিংবা অন্য অস্থায়ী স্থানে নিতে হয়। এতে শিক্ষা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। বর্তমানে রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, চারুকলা ও সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ মোট চারটি পদ শূন্য রয়েছে। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াত ও আড্ডার কারণে শিক্ষক-অভিভাবকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়।

১৯৯৩ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৯৪ সালের ১ জানুয়ারি শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ৩৩ বছর ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সময় বিদ্যালয়ের দুটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ভেঙে পড়ে। পরে সেগুলো পুনর্নির্মাণ করে সেমিপাকা ঘর করা হয়েছে। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের ফলাফল সন্তোষজনক বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় বিদ্যালয়টির পাসের হার ৫৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন শিক্ষার্থী। আগামী বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে প্রায় ৯০ জন শিক্ষার্থী।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আ. সহিদ তালুকদার বলেন, "গত সরকারের আমলে বহুতল ভবনের জন্য চারবার আবেদন করেও কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। অথচ আশপাশের অনেক বিদ্যালয়ে একাধিক ভবন নির্মাণ হয়েছে। ভবনসংকটের কারণে এখন টিনের ঘরেও ক্লাস নিতে হচ্ছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।" তিনি আরও বলেন, "বিদ্যালয়ের একটি আধুনিক বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ হলে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের পরিবেশ অনেক উন্নত হবে। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।"

বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আবদুল কাদের সেলিম বলেন, "শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়া ঠেকাতে এখন আর দেরি করার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে একটি আধুনিক একাডেমিক ভবন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত ওয়াশ ব্লক, বিজ্ঞানাগার, ডিজিটাল কম্পিউটার ল্যাব, পর্যাপ্ত বেঞ্চ ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।" তিনি আরও বলেন, "এ বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে ধর্ম ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন শাহজাহান প্রতিষ্ঠা করেছেন।"

ভোলা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মফিকুল ইসলাম বলেন, "বিদ্যালয়টি সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনের নাজুক অবস্থা দেখা গেছে। বহুতল ভবনের জন্য বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় ছবি ও প্রতিবেদনসহ বিষয়টি প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে উপস্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে ভবিষ্যতে বিদ্যালয়টির উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।"