সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ৪৮ জনের নাম উল্লেখ থাকলেও অন্তত ২৩ জন দাবি করছেন, তারা মিছিলের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। এর মধ্যে রয়েছে সাংবাদিক, স্কুলশিক্ষক, স্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং পবিত্র মক্কায় অবস্থানরত এক ব্যক্তি।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মধ্যনগর থানায় দায়ের করা মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করেছে পুলিশ। মামলার আসামিদের মধ্যে তাহিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের রতনশ্রী গ্রামের মৃত আইয়ুব আলীর ছেলে আরটিভির ডিজিটাল প্রতিনিধি শওকত হাসান সৈকত, কামড়াবন্দ গ্রামের মৃত ওয়াহেদ মিয়ার ছেলে যুবদল কর্মী রাসেল আহমদ, দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের হলহলিয়া গ্রামের কাদের পাশা, বাদাঘাট ইউনিয়নের সোহালা গ্রামের উপজেলা মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ, উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের চারাগাঁও গ্রামের কলাগাঁও টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক জাবের আহমদ জাবেদ এবং তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের সিলেটের একটি এনজিওতে কর্মরত রাজন চন্দ্র রয়েছেন। এ ছাড়া বাদাঘাট ইউনিয়নের পৈলনপুর গ্রামের আজহারুল ইসলাম সোহাগ, হাসান মিয়া, ইকবাল, ফারুক, বিপ্লব হাসান ইমন, জুয়েল আখুঞ্জি, শাহিন মিয়া, জিয়া উদ্দিন, সাজিদ মিয়া, আঙ্গুর মিয়া, শাখাওয়াত হোসেন শিপন, মিয়া হোসেন, সেলিম ভূঁইয়া, শাকিল আহমদ লিজান ও লিক্সন মিয়াসহ আরও বেশ কয়েকজনের নাম মামলায় আছে।
মামলার আসামি ও তাহিরপুর উপজেলা মাদক নির্মূল কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ বলেন, "মাদক ব্যবসায়ীদের ঘৃণ্য চক্রান্তের শিকার। মাদকের বিরুদ্ধে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার কারণে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা কিছু অসৎ লোক আমাকে এই মামলায় ফাঁসিয়েছে। তবে যতদিন বাঁচব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে যাব। এতে বিন্দুমাত্র পিছপা হব না।"
বাদাঘাট বাজারের মোবাইল ব্যবসায়ী ও যুবদল কর্মী রাসেল আহমদ বলেন, "ব্যবসার পাশাপাশি যুবদলের সক্রিয় কর্মী। মামলায় আমার নাম কীভাবে এলো, আমি বুঝতে পারছি না। কারও ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে এমনটি করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।"
মামলার আসামি সাংবাদিক শওকত হাসান সৈকত বলেন, "ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। আমি ঘটনাস্থলেও ছিলাম না। অন্য থানার একটি ঘটনায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমাকে আসামি করার কোনো কারণ আমি বুঝে উঠতে পারছি না।" তিনি আরও বলেন, "উপজেলায় সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতা করার কারণে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে আমাকে নিয়মিত সংবাদ করতে হয়। এ কারণে হয়তো আমার উপজেলার বিএনপির কিছু নেতার কাছে আমি বিরক্তির কারণ হয়ে থাকতে পারি। একটি মিথ্যা মামলার কারণে গত সাত দিন ধরে আমাকে ফেরারি জীবনযাপন করতে হচ্ছে।"
সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বলেন, "সৈকত আপাদমস্তক একজন সাংবাদিক। ঘটনার দিন সে নিজেও সংবাদ করেছে এবং সেদিন তাহিরপুরেই ছিল। তাহিরপুরে থেকে কীভাবে মধ্যনগরের মিছিলের মামলার আসামি হয়, সেটি বোধগম্য নয়। আমরা এ ঘটনার নিন্দা জানাই এবং সৈকতসহ নির্দোষ ব্যক্তিদের যাতে কোনো ধরনের হয়রানি করা না হয়, সে দাবি জানাচ্ছি।"
তাহিরপুর উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক হাফিজ উদ্দিন এক ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, "মিছিলে অংশ নেওয়া নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার ও কারাবরণের ঝুঁকি জেনেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু মামলায় এমন কিছু ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে, যাদের কেউ রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়, কেউ সাংবাদিক, আবার কেউ পবিত্র মক্কায় অবস্থান করছিলেন কিংবা মিছিলের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, "যারা মিছিল করেছে, তাদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাদের রেখে নিরপরাধদের মামলার আসামি করা হয়েছে, এটা দুঃখজনক। মূলত ব্যক্তি আক্রোশ থেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করার জন্য এমনটা করা হয়েছে।"
মামলার বাদী শাহাজাহান মিয়া বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, "তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা সমন্বয় করে আসামিদের তালিকা থানায় দিয়েছেন। এতে আমি বাদী হয়েছি।"
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সীমান্ত এলাকায় সংঘটিত মিছিলের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও তা যথাযথভাবে যাচাই না করে কিংবা ঘটনার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অবস্থান বিবেচনায় না নিয়ে মামলা করা হয়েছে। এতে প্রকৃত জড়িতদের পাশাপাশি নিরপরাধ ব্যক্তিরাও হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার বলেন, "মামলার বাদী পুলিশ নয়, অন্য একজন। পুলিশ মামলাটি তদন্ত করবে। তদন্তে কারও বিরুদ্ধে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়া গেলে পরবর্তীতে তার নাম বাদ দেওয়া হবে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হবে না।"