রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলে অভিযানের সময় আটক নারীদের মুখ থেকে মাস্ক, ওড়না বা শাড়ির আঁচল সরাতে বাধ্য করার অভিযোগ সামনে আসায় দেশব্যাপী উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে নারী পুলিশ সদস্যদের আটক নারীদের মুখ দেখানোর চেষ্টা এবং মুখ না দেখালে মারধরের হুমকি দেওয়ার দৃশ্য ফুটেছে। বিষয়টি নিয়ে একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা এটিকে ‘টুকটাক ভুল’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার ক্ষুণ্নকারী এই ঘটনাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ায় ভিডিও ধারণ করতে পারে, কিন্তু তা গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ নেই। ক্যামেরার সামনে কাউকে মুখ খুলতে বাধ্য করা বা জনসমক্ষে পরিচয় প্রকাশ করা আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযানে আটক হওয়া মানেই কেউ অপরাধী নয়; তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত শেষে আদালতই দোষী সাব্যস্ত করবেন।
বিচারের আগেই কারও চেহারা বা পরিচয় প্রকাশ করে সামাজিকভাবে হেয় করা মূলত একধরনের বহিঃবিচার বা শাস্তি। এই শাস্তি আদালত প্রদান করেননি, বরং পুলিশ, ইউটিউবার এবং কিছু সংবাদমাধ্যম মিলে তা আরোপ করছে। নারী হওয়ার কারণে এর সামাজিক পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে এবং ভবিষ্যতে তারা অপমান, হয়রানি বা সহিংসতার শিকার হতে পারেন। সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা লাঞ্ছনাকর আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কাউকে ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতে বাধ্য করা বা তাঁর অসহায় অবস্থাকে প্রচারের উপকরণ বানানো মানুষের মৌলিক মর্যাদার সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০১২ সালে হাইকোর্ট আটক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গণমাধ্যমের সামনে হাজির না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফলে বর্তমান আচরণ শুধু অনৈতিকই নয়, আদালতের নির্দেশনা ও সাংবিধানিক অধিকারেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এ প্রসঙ্গে কিছু গণমাধ্যমের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। পুলিশের সঙ্গে অভিযানে গিয়ে আটক ব্যক্তিদের ভিডিও ধারণ করা সাংবাদিকতা নয়। ভিউ বাড়ানোর আশায় মানুষের বিপন্নতা, কান্না ও অপমানকে পণ্য বানানো চরম অসংবেদনশীলতা। জনস্বার্থের সাংবাদিকতা অপরাধ ও অভিযানের তথ্য প্রকাশ করবে, কিন্তু সন্দেহভাজনের পরিচয় প্রকাশ করে তাঁকে সামাজিক বিচারের মুখে ঠেলে দেবে না। বিশেষ করে ‘অসামাজিক কার্যকলাপের’ অভিযোগে আটক নারীদের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
অভিযানের আগে ইউটিউবার বা সংবাদকর্মীদের ডেকে নেওয়ার যে অভিযোগ তদন্তের দাবি রাখে। পুলিশ কোনো অভিযানকে প্রচারণামূলক দৃশ্যে পরিণত করতে পারে না। প্রয়োজনে পরে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যক্তিগত পরিচয় গোপন রেখেই তথ্য জানানো সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ অপরাধ দমন করা, মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেওয়া নয়। গণমাধ্যমের দায়িত্ব ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো, অসহায় মানুষের অপমানকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া নয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের উচিত ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত শুরু করা। কার নির্দেশে নারীদের মুখ দেখানো হয়েছিল, ভিডিও ধারণের অনুমতি কে দিয়েছিলেন এবং তা কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল—এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে সব বাহিনীর জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করতে হবে, যাতে অভিযানের সময় আটক ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং পরিচয় প্রকাশ বন্ধ হয়।