সারা দেশের ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসাগুলোর নিয়ন্ত্রক ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা-নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

২০১৩ সালে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আমলে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর নিয়োগসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়মের কোনো বালাই ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলেও নিয়োগ নিয়ে দেখা দিয়েছে বিশৃঙ্খলা। সম্প্রতি নিয়ম ভেঙে কয়েকজন অধ্যাপক ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।

চাকরিবিধি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পদোন্নতি, সরাসরি নিয়োগ বা প্রেষণের মাধ্যমে অধ্যাপক পদে নিয়োগের কথা। তবে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান তা অমান্য করে গত আড়াই মাসে লিয়েনে চারজন অধ্যাপক নিয়োগ দিয়েছেন। লিয়েন হলো মূল প্রতিষ্ঠানের চাকরি বজায় রেখে অন্যত্র কাজের জন্য অনুমোদিত বিশেষ ছুটি।

গত আড়াই মাসে নিয়োগ পাওয়া চারজন হলেন—কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. গোলাম রব্বানী (যোগদান ২১ জুন), দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসর ড. ইদ্রীস আলী, একই বিভাগের প্রফেসর ড. হুসাইন আহমাদ (১১ আগস্ট), আল ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের প্রফেসর ড. এ কে মুহা. নুরুল ইসলাম (যোগদান ৮ জুলাই)।

এর মধ্যে সম্প্রতি প্রফেসর ড. ইদ্রীস আলী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার নিযুক্ত হওয়ায় সেখানে চলে গেছেন। এখন নতুন করে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের আরও এক অধ্যাপককে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

লিয়েনে আরও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পরিচালক (অর্থ) পদে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার মো. আবু বকরকে (১ জুলাই)। কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে থাকা উপ-রেজিস্ট্রার ড. ওয়ালিউর রহমানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে (১২ জুলাই) পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক হিসেবে।

গত বছরের মার্চে বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সেপ্টেম্বরে এসব নিয়োগ স্থগিত করে নিষেধাজ্ঞা দেয় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সেটি এখনও প্রত্যাহার না হলেও বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান নিজের পছন্দের লোকজনকে লিয়েনে নিয়োগ দিয়েছেন।

২০২৪ সালের ২৮ মে ইউজিসির অর্থ পরিচালক স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বলা হয়, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেষণে আগত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবশ্যই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশের মাধ্যমে যোগদান সম্পন্ন করতে হবে।’ তবে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিধিও মানেননি বর্তমান উপাচার্য।

উপাচার্য তার আগের কর্মস্থল ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপকসহ ছয়জনকে নিয়োগ দিয়েছেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষক ড. এ কে মুহা. নুরুল ইসলামকে আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাকে রেজিস্ট্রারের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী, সিন্ডিকেট সভার অনুমোদন নিয়ে এরপর জনবল নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু সূত্র জানিয়েছে, এক্ষেত্রে তাও করা হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নিয়োগ নিয়ে ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু পদে লিয়েনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। উপাচার্য এসব অনিয়ম করছেন। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কর্তা ব্যক্তিরাও ক্ষুব্ধ বলে তারা ইউজিসিকে জানিয়েছেন।’

ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা অমান্য ও বিধি লঙ্ঘন করে বিভিন্ন নিয়োগের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান বলেন, ‘গত মার্চে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেছি। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজের জন্য যে জনবল দরকার ছিল তা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নেওয়ার সময়-সুযোগ হয়নি। গত ২০ বছরে যথাযথভাবে নিয়োগ দিয়ে এসব পদে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়নি।’

আল-ফিকহ অ্যান্ড ল বিভাগের শিক্ষককে ইসলামিক স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে উপাচার্য বলেন, এই শিক্ষক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন আল কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজে বিভাগে। তাই তাকে ইসলামিক স্টাডিজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক ও কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও দাবি করেন উপাচার্য ড. আবু জাফর খান।