অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের সাবেক ব্যবস্থাপক দিশা সালিয়ানের মৃত্যু মামলায় নতুন মোড় ফিরেছে। বম্বে হাইকোর্ট এই মামলার তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই)-এর কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বুধবার বিচারপতি সারাং কোটওয়াল ও বিচারপতি রণজিৎ সিং ভোসলের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ জারি করে। গত বছর দিশার পিতা সতীশ সালিয়ান মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় হাইকোর্টে আবেদন করলে শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরের নামও উল্লেখ করা হয়েছিল।
২০২০ সালের ৮ জুন মুম্বাইয়ের মালাড এলাকার একটি বহুতল ভবনের ১৪ তলা থেকে পড়ে দিশা সালিয়ানের মৃত্যু হয়। প্রাথমিকভাবে মুম্বাই পুলিশ ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে। তবে সতীশ সালিয়ান শুরু থেকেই এ বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। তিনি অভিযোগ করেন, দিশাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বাঁচাতে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, এবার সিবিআই এ ঘটনার তদন্ত পরিচালনা করবে। একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার কথা আদালত জানিয়েছে। তদন্তে কোনো গুরুতর অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযোগপত্র জমা দিতে হবে। অন্যদিকে, যদি তেমন কোনো প্রমাণ না মিলে, তবে উপযুক্ত আদালতে মামলা বন্ধের জন্য ‘ক্লোজার রিপোর্ট’ জমা দিতে হবে।
আদিত্য ঠাকরেকে এ মামলায় অভিযুক্ত করার দাবি নিয়েও আদালত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। বিচারপতিরা বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা কারও বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। দিশার বাবার অভিযোগ সত্যি হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। তবে পুলিশকে এফআইআর দায়ের করে তদন্ত করা উচিত ছিল বলে মৌখিকভাবে মন্তব্য করেন বিচারপতিরা। তাঁদের মতে, মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারকে একটি চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
দিশার বাবার আইনজীবী নীলেশ ওঝা আদালতে দাবি করেন, মুম্বাই পুলিশ দিশার ময়নাতদন্তের রিপোর্ট সম্পর্কে তাঁর বাবাকে জানায়নি। হাইকোর্টে আবেদন করার প্রায় পাঁচ বছর পর তাঁকে ওই রিপোর্ট দেওয়া হয়। আইনজীবী আরও প্রশ্ন তোলেন, সতীশ সালিয়ান যাঁদের বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আদিত্য ঠাকরে ও অন্যদের বিরুদ্ধে পুলিশ কেন এফআইআর করেনি।
অন্যদিকে মহারাষ্ট্র সরকার মুম্বাই পুলিশের মাধ্যমে আদালতে জানায়, দিশার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে অভিযুক্ত করার মতো কোনো প্রমাণ তারা পায়নি। প্রধান সরকারি আইনজীবী শিশির হিরে বলেন, "তদন্তে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে দিশা আত্মহত্যা করতে পারেন অথবা দুর্ঘটনাবশত ভবন থেকে পড়ে যেতে পারেন।" সরকারি আইনজীবী আরও প্রশ্ন করেন, "সতীশ সালিয়ান আগে কেন কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেননি।" তাঁর দাবি, দিশার বাবা ও মা—দুজনই পুলিশের কাছে একাধিকবার নিজেদের বক্তব্য জানিয়েছিলেন।
আদিত্য ঠাকরের হয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুদীপ পাসবোলা আবেদনটির বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য, পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে আদালতে সরকারি পক্ষ জানায়, ২০২০ সালের অক্টোবরেই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর প্রতিবেদন বা এডিআর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাথমিক তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি আবার খতিয়ে দেখা হয়।
পরবর্তী তদন্তেও দিশাকে হত্যার অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করার মতো শক্ত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতকে জানায় সরকার। এখন বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশে দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় সিবিআই নতুন করে তদন্ত করবে। তবে তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আদিত্য ঠাকরে বা অন্য কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না, এ বিষয়ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন আদালত।