সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনে পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের নিয়ে পর্যটকদের ভিড় জমে এই হাওরে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনার কারণে এই আনন্দভ্রমণ এখন বিষাদের খবরে পরিণত হচ্ছে। মুক্তকণ্ঠের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চিন্তার বিষয়টি যে, গত চার মাসে হাওরে ঘুরতে আসা পাঁচজন পর্যটক (শিশুসহ) নানাভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে আগস্ট মাসের শুধুমাত্র ২০ দিনেই মারা গেছেন তিনজন। এই পরিসংখ্যান হাওরভিত্তিক পর্যটনের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর ফাঁকির ইঙ্গিত দেয়।
ঘটনার ধরন দেখলে বোঝা যায়, চলন্ত নৌযান থেকে পড়া, ভেসে যাওয়া বা ইঞ্জিনের সাথে যুক্ত হয়েই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু হয়েছে। এসবের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জনসচেতনতার অভাব ও নিরাপত্তাবিধি মানতে অনীহা। লাইফ জ্যাকেট পরার স্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও দুর্ঘটনাকবলিতদের অধিকাংশের কাছেই তা ছিল না। নৌযান চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এতদূর উদাসীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।
বিষয়টি আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটন শৃঙ্খলা রক্ষায় ১৩ দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করলেও তার বাস্তবায়ন এখনো স্বপ্নের চেয়েও দূরে। নৌযানের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন সংক্রান্ত বিধানের কথা থাকলেও, হাওরে চলাচলকারী চার শতাধিক নৌযানের মধ্যে মাত্র গুটি কয়েকের আবেদন করা হয়েছে। স্থানীয় নৌযানমালিকদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা মানতে গাফিলতির প্রবণতা স্পষ্ট।
এই বিশৃঙ্খলা ও উদাসীনতার বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ও সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। দুর্ঘটনা রোধে কর্তৃপক্ষের ঘোষিত কঠোর অবস্থান যদি কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ব্যর্থ হবে। যেখানে আইন অমান্যের সংস্কৃতি প্রবল, সেখানে কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আইন না মানার পেছনের আর্থসামাজিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানিক নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা, পর্যটকদের নিজস্ব দায়িত্ববোধও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জীবনসুরক্ষার স্বার্থে লাইফ জ্যাকেট পরা, চলন্ত নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে বিরত থাকা এবং নির্দেশিকা মেনে চলা—এগুলো অনুসরণ করলেই অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। টাঙ্গুয়ার হাওরের নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পর্যটন নিশ্চিত করতে সব পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে।