দলবদলের বাজারে বড় অঙ্কের কেনাকাটার খবরই সাধারণত সবার নজর কাড়ে। কিন্তু খেলোয়াড় বিক্রি করেও যে ক্লাবগুলো বিপুল অঙ্কের অর্থ আয় করে, সেই তালিকাটিও কম চমকপ্রদ নয়। এক দলবদল উইন্ডোতে সবচেয়ে বেশি আয় করা ক্লাবগুলোর তালিকায় পুরোনো কিছু নামের পাশাপাশি এবার জায়গা করে নিয়েছে কয়েকটি নতুন ক্লাব।

২০১৭–১৮ মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রির বাজারে ডর্টমুন্ডের আয় ছিল ২৮ কোটি ৩৯ লাখ ইউরো। ওই সময় জার্মান ক্লাবটি সবচেয়ে বেশি অর্থ পেয়েছিল উসমান দেম্বেলেকে বার্সেলোনায় বিক্রি করে। পাশাপাশি পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াং, রোমেলু লুকাকুদেরও বিক্রি করা হয়েছিল ওই মৌসুমে।

খেলোয়াড় তৈরি করে বড় ক্লাবে বিক্রি করা বেনফিকার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক মডেল। এর বড় উদাহরণ ২০২২–২৩ মৌসুম। ওই মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে পর্তুগিজ ক্লাবটির আয় ছিল ২৮ কোটি ৮৯ লাখ ইউরো। সবচেয়ে বড় অঙ্কটি এসেছিল এনজো ফার্নান্দেজকে চেলসির কাছে বিক্রি করে। বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারের জন্য চেলসি ১২ কোটি ১০ লাখ ইউরো দেয়। এ ছাড়া গনসালো রামোস, আলেহান্দ্রো গ্রিমালদো ও আরও কয়েকজন খেলোয়াড়ের দলবদল থেকেও বেনফিকা বড় অঙ্কের অর্থ পায়।

২০২৫–২৬ মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রি করে ৩১ কোটি ৪ লাখ ইউরো আয় করে বোর্নমাউথ। ইংলিশ ক্লাবটির বড় কয়েকটি বিক্রিই এই অঙ্ককে এত ওপরে নিয়ে যায়। আঁতোয়ান সেমেনিওকে ম্যানচেস্টার সিটিতে ৭ কোটি ২০ লাখ ইউরোতে, ইলিয়া জাবার্নিকে পিএসজিতে ৬ কোটি ৩০ লাখ ইউরোতে এবং ডিন হুইসেনকে রিয়াল মাদ্রিদে ৬ কোটি ২৫ লাখ ইউরোতে বিক্রি করে বোর্নমাউথ। এ ছাড়া মিলোস কেরকেজ (লিভারপুলে) আর দাঙ্গো ওয়াতারাকে (ব্রেন্টফোর্ডে) বিক্রি করেও আসে প্রায় ৯ কোটি ইউরো।

২০১৯–২০ মৌসুমে নিজেদের কয়েকজন বড় তারকাকে বিক্রি করে ৩১ কোটি ৬৩ লাখ ইউরো আয় করে আতলেতিকো মাদ্রিদ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিল আঁতোয়ান গ্রিজমানের বার্সেলোনায় যাওয়া। ফরাসি ফরোয়ার্ডের জন্য বার্সেলোনা দেয় ১২ কোটি ইউরো। লুকাস এরনান্দেজকে বায়ার্ন মিউনিখে বিক্রি করে আতলেতিকো পায় ৮ কোটি ইউরো। ম্যানচেস্টার সিটিতে রদ্রির দলবদল থেকে আসে আরও ৭ কোটি ইউরো।

চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী পিএসজি এবার নিজেদের স্কোয়াডের কয়েকজন খেলোয়াড়কে বিক্রি করে ৩৩ কোটি ৪৩ লাখ ইউরো আয় করেছে। সবচেয়ে বড় বিক্রি ব্র্যাডলি বারকোলা। ফরাসি ফরোয়ার্ডকে লিভারপুলে পাঠিয়ে পিএসজি পেয়েছে ১২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। গনসালো রামোস এসি মিলানে গেছেন ৭ কোটি ৪০ লাখ ইউরোতে। ইব্রাহিম এমবায়ে অ্যাস্টন ভিলায় গেছেন ৫ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে। এ ছাড়া রান্দাল কোলো মুয়ানি ৪ কোটি ১২ লাখ, কাং-ইন লি ৩ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে ক্লাব ছেড়েছেন।

এবারের দলবদলে ম্যানচেস্টার সিটির দলেও বড় পরিবর্তন এসেছে। খেলোয়াড় বিক্রি থেকে তাদের আয় ৩৩ কোটি ৭০ লাখ ২০ হাজার ইউরো। স্যাভিনিওকে টটেনহামে বিক্রি করে সিটি পেয়েছে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ইউরো। নিকো গঞ্জালেস নিউক্যাসলে গেছেন ৫ কোটি ৬০ লাখ ইউরোতে। তিজানি রেইন্ডার্স, রদ্রি ও জেমস ট্র্যাফোর্ডের দলবদল থেকেও এসেছে বড় অঙ্কের অর্থ। ম্যানুয়েল আকাঞ্জি, নাথান একে ও ইসা কাবোরের বিক্রিও যোগ হয়েছে মোট আয়ে। তবে খেলোয়াড় কেনায় সিটি খরচ করেছে ৫২ কোটি ৬২ লাখ ইউরো। তাই বিক্রিতে এত আয় করেও তাদের দলবদল ব্যালেন্সে ঘাটতি ১৮ কোটি ৯১ লাখ ৮০ হাজার ইউরো।

খেলোয়াড় বেচাকেনাকে ক্লাব পরিচালনার নিয়মিত অংশ বানিয়ে ফেলা চেলসি এই তালিকায় একবার নয়, একাধিকবার আছে। ২০২৫–২৬ মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রি করে তারা আয় করেছিল ৩৩ কোটি ৯২ লাখ ইউরো। ননি মাদুয়েকেকে আর্সেনালে ৫ কোটি ৬০ লাখ ইউরোতে বিক্রি করার পাশাপাশি ক্রিস্টোফার এনকুনকু, জোয়াও ফেলিক্স, দর্জে পেত্রোভিচ, লেসলি উগোচুকু, কিয়ারনান ডিউসবারি-হল, রেনাতো ভেইগা, আরমান্দো ব্রোয়াহ ও কার্নি চুকুয়েমেকার বিক্রি থেকেও বড় অঙ্কের অর্থ পেয়েছিল চেলসি। এই মৌসুমে সর্বমোট ১৬ জন খেলোয়াড় স্টামফোর্ড ব্রিজ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।

এবারের দলবদলে অ্যাস্টন ভিলা হারিয়েছে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তবে বিনিময়ে পেয়েছে বিশাল অঙ্কের অর্থ—মোট ৩৬ কোটি ২ লাখ ইউরো। মর্গান রজার্সকে চেলসির কাছে ১৩ কোটি ৮০ লাখ ইউরোতে বিক্রি করেছে ভিলা। এজরি কনসা আর্সেনালে গেছেন ৫ কোটি ৯৬ লাখ ইউরোতে। ইউরি টিলেমানসের জন্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দিয়েছে ৪ কোটি ১০ লাখ ইউরো। এ ছাড়া ওলি ওয়াটকিনস ৫ কোটি ৮০ লাখ, ডনিয়েল মালেন ২ কোটি ৫০ লাখ, এনজো বারেনেচিয়া ১ কোটি ২০ লাখ, লুইস ডবিন ১ কোটি ৫ লাখ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ৭৫ লাখে ক্লাব ছেড়েছেন। ভিলার খেলোয়াড় বিক্রির আয় ৩৬ কোটি ২ লাখ ইউরো হলেও নতুন খেলোয়াড় কিনতে খরচ হয়েছে ৩০ কোটি ২ লাখ ইউরো।

গত বছর পর্যন্ত এক মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ আয়ের রেকর্ড ছিল মোনাকোর। ২০১৮–১৯ মৌসুমে ফরাসি লিগের ক্লাবটি আয় করেছিল ৩৬ কোটি ৭২ লাখ ইউরো। এই আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ এসেছিল কিলিয়ান এমবাপ্পেকে পিএসজির কাছে বিক্রি করে। ১৮ কোটি ইউরোর সেই দলবদলই মোনাকোর মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক। এ ছাড়া টমাস লেমারকে আতলেতিকো মাদ্রিদে ৭ কোটি ২০ লাখ ইউরোতে এবং ফাবিনিয়োকে লিভারপুলে ৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরোতে বিক্রি করেছিল মোনাকো।

এক মৌসুমে খেলোয়াড় বিক্রি থেকে সর্বোচ্চ আয়ের নতুন রেকর্ড এখন চেলসির। ২০২৬–২৭ মৌসুমের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ৪৪ কোটি ৭৮ লাখ ইউরোর খেলোয়াড় বিক্রি করেছে তারা। রেকর্ড হয়ে যাওয়ার মূলে দলবদলের শেষ দিনে এনজো ফার্নান্দেজের বিক্রি। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারের জন্য ম্যানচেস্টার সিটি দিয়েছে ১৪ কোটি ৫০ লাখ ইউরো। এনজো ছাড়াও আন্দ্রে সান্তোসকে ৫ কোটি ৬৩ লাখ, নিকোলা জ্যাকসনকে ৫ কোটি ৫৫ লাখ, মার্ক কুকুরেয়াকে ৫ কোটি ৫০ লাখ এবং লিয়াম ডেলাপকে ৫ কোটি ২০ লাখ ইউরোতে বিক্রি করেছে চেলসি। তবে চেলসির খেলোয়াড় কেনায় খরচও এবার কম নয়। ৪০ কোটি ৬৭ লাখ ইউরো ব্যয় করে দলটি দলবদলের বাজার শেষ করেছে ৪ কোটি ১১ লাখ ইউরো ব্যালেন্স নিয়ে।