১৯৯৩ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে পার হয়েছিল। মুম্বাই ধারাবাহিক বোমা হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই সেন্সরশিপ, নৈতিকতা ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে চলচ্চিত্র মহলে তীব্র আলোচনা চলছিল। সেই সময়েই সুভাষ ঘাই পরিচালিত ‘খলনায়ক’ মুক্তির অপেক্ষায় ছিল। বর্তমানে এটি বলিউডের বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত হলেও, মুক্তির আগ পর্যন্ত ছবিটি মামলা, রাজনৈতিক চাপ, অভিনেতার সংকট এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকিতে ঘেরা ছিল। সম্প্রতি সুভাষ ঘাইয়ের সাক্ষাৎকার এবং সে সময়ের সংবাদ প্রতিবেদন ও চলচ্চিত্র ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ‘খলনায়ক’-এর মুক্তি যাত্রা বলিউডের ইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ছিল।

ছবির ‘চোলি কে পিছে ক্যা হ্যায়’ গানটি আজও জনপ্রিয় তালিকায় থাকলেও ১৯৯৩ সালে এর মুক্তি নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। বিভিন্ন নারী ও সামাজিক সংগঠনসহ রাজনৈতিক গোষ্ঠী গানটিকে নারী অবমাননা ও অশ্লীলতা বলে অভিযোগ তোলে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ মিছিল হয় এবং ছবি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত পৌঁছায়। মুক্তির আগের দিনগুলোতে নির্মাতারা আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চিত ছিলেন। সুভাষ ঘাই পরে স্মরণ করেন, তিনি মনে করেছিলেন, যদি আদালত গানটির বিরুদ্ধে রায় দেন, তাহলে পুরো ছবির মুক্তিই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

আদালতে গানটিকে পুরো সিনেমার প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে বিচার করা উচিত নয় বলে যুক্তি দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত আদালত গানটি নিষিদ্ধ করেননি। এই রায় শুধু ছবিটিকেই রক্ষা করেনি, ভারতীয় চলচ্চিত্রে শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

বিতর্কের সময় মহারাষ্ট্রে শিবসেনার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ মুম্বাই হিন্দি চলচ্চিত্রশিল্পের কেন্দ্র। সুভাষ ঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বাল ঠাকরের সঙ্গে দেখা করলে ঠাকরে পুরো বিতর্ককে হালকাভাবে উড়িয়ে দেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য ছিল—‘চোলির পেছনে যা আছে, তা তো চোলির পেছনেই আছে।’ অর্থাৎ তিনি মনে করেছিলেন গানটিকে অযথা রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে টেনে আনা হচ্ছে। তাঁর এই অবস্থানের ফলে মহারাষ্ট্রে ছবিটি ঘিরে বড় ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়।

গান নিয়ে বিতর্ক থামতে না থামতেই আসে আরেক বড় ধাক্কা। ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে মুম্বাই ধারাবাহিক বিস্ফোরণের তদন্তে সঞ্জয় দত্তকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে টাডা আইনও প্রয়োগ করা হয়েছিল। হঠাৎ করেই ছবির প্রধান অভিনেতা কারাগারে পড়ায় প্রচারণা প্রায় থেমে যায়। সংবাদমাধ্যমে ছবির গল্পের চেয়ে বেশি আলোচনা হতে থাকে সঞ্জয় দত্তের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল, ‘খলনায়ক’-এ সঞ্জয় দত্ত অভিনয় করেছিলেন বল্লু নামের এক পলাতক অপরাধীর চরিত্রে। বাস্তবেও তখন তিনি পুলিশের হেফাজতে। ফলে সিনেমা ও বাস্তব যেন একে অপরের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হয়।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘খলনায়ক’-এর চারপাশের বিতর্ক সাধারণ মানুষের কৌতূহল বাড়িয়েছিল। গান নিয়ে আপত্তি, আদালতের মামলা, সঞ্জয় দত্তের গ্রেপ্তার—সব মিলিয়ে ছবিটি মুক্তির আগেই দেশের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমায় পরিণত হয়। তবে বিতর্ক দিয়ে দর্শককে হলে আনা গেলেও ছবিকে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য দিতে পারে শুধু ভালো নির্মাণ। সেই পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হয়েছিল ‘খলনায়ক’।

সুভাষ ঘাই আরও জানিয়েছেন, সেই সময় তাঁকে আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকেও চাঁদা দাবি করে ফোন করা হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে বলিউডে আন্ডারওয়ার্ল্ডের প্রভাব নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। অনেক নির্মাতা, প্রযোজক ও অভিনেতাই পরে এমন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। ঘাইয়ের দাবি, ‘খলনায়ক’ নির্মাণের সময় তিনিও সেই চাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন।

ছবিতে মাধুরী দীক্ষিতের অভিনয় এবং নাচ ছিল অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে ‘চোলি কে পিছে’, ‘পালখি মে হোকে সওয়ার’ ও অন্যান্য গানে তাঁর পারফরম্যান্স দর্শকদের মুগ্ধ করে। বিতর্কের কেন্দ্রে থেকেও মাধুরীর জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং এই ছবির পর তিনি আরও শক্তভাবে বলিউডের শীর্ষ নায়িকার অবস্থান ধরে রাখেন।

সঞ্জয় দত্তের অভিনয়জীবনে ‘খলনায়ক’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। বাস্তব জীবনের আইনি লড়াইয়ের কারণে তাঁর ক্যারিয়ার বড় সংকটে পড়লেও ছবিতে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। অনেক সমালোচকের মতে, বল্লু চরিত্রটি সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অভিনয়।

মুক্তির তিন দশকেরও বেশি সময় পরও ‘খলনায়ক’ শুধু একটি সফল সিনেমা হিসেবে নয়, ভারতীয় জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। এই ছবি দেখিয়েছে, একটি গান কীভাবে জাতীয় বিতর্ক তৈরি করতে পারে, আদালত কীভাবে শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারেন, একজন তারকার ব্যক্তিগত সংকট কীভাবে পুরো চলচ্চিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে এবং রাজনৈতিক সমর্থন বা বিরোধিতা একটি ছবির ভাগ্য কতটা বদলে দিতে পারে।

d্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে