সমুদ্রের পানিতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা সামুদ্রিক শৈবাল এখন বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। উপকূলীয় জনপদে এতদিন অবহেলিত বলেই মনে করা হতো এই শৈবালকে। তবে গবেষক ও উদ্যোক্তাদের মতে, এটি প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্য, পরিপূরক ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি সম্ভব। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) গবেষক দল ইতোমধ্যে শৈবাল চাষ, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং সাফল্যও পেয়েছেন।
শৈবালে ফাইবার, প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ওমেগা-থ্রি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান সমৃদ্ধ। এসব পুষ্টি উপাদান খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য। পবিপ্রবির খাদ্য মাইক্রোবায়োলজি ও নিরাপত্তা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, “সামুদ্রিক শৈবালে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এটি সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে নিরাপদ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা গেলে খাদ্যপণ্যের বৈচিত্রের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যবহারও বাড়ানো সম্ভব।” জাপানের সুশি তৈরিতে ব্যবহৃত ‘নরি শিট’ থেকে শুরু করে আইসক্রিম, মিষ্টি, জিলাপি, বিস্কুট, সসেজ ও জেলি পর্যন্ত বিভিন্ন খাবারে শৈবাল ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। এছাড়া সাবান, টোনারসহ প্রসাধনী ও ব্যক্তিগত যত্নের পণ্যেও এর চাহিদা ক্রমবর্ধমান।
লুথ্যারন হেলথ কেয়ারের মেডিকেল অফিসার ডা. মোস্তারিয়া জান্নাত বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “সামুদ্রিক শৈবালে থাকা বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান মানবদেহের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা জরুরি।”
দীর্ঘ উপকূলরেখা ও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মাছ ধরা ও কৃষিপেশায় ঝুঁকি বাড়ার প্রেক্ষিতে শৈবাল চাষ একটি স্থায়ী বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ছোট পরিসরে শুরু করে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ করলে উপকূলবাসীর আয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সংগ্রহ, শুকানো, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেটজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমাতে ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় টেকসই সামুদ্রিক সম্পদের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
বর্তমানে গবেষণাগার ও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সাফল্য আসলেও দেশের উপকূলে শৈবাল চাষকে বড় পরিসরে বাণিজ্যিক খাতে রূপ দেওয়া হয়নি। পবিপ্রবির ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রাজীব সরকার বলেন, “সামুদ্রিক শৈবাল শুধু খাদ্য হিসেবেই নয়, বিভিন্ন শিল্প ও প্রসাধনসামগ্রীর কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব। এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে চাষ সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।” গবেষণাগারের জ্ঞান মাঠপর্যায়ের চাষিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, মানসম্মত উৎপাদন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাজার নিশ্চিত না থাকলে উৎপাদন বৃদ্ধি কঠিন। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষক, উদ্যোক্তা ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য।
পবিপ্রবির ফিসারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. আরিফুল আলম বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক শৈবাল চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে এটি উপকূলের মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হতে পারে। তবে এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন।” প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, উদ্যোক্তা গঠন ও কার্যকর বাজারজাতকরণের মাধ্যমে যদি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তবে অযত্নে সাগরে বেড়ে ওঠা এই শৈবালই উপকূলীয় অর্থনীতির নতুন চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে।