জীবনের প্রতিটি বাঁকে মানুষকে প্রতিনিয়ত নানা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। মানুষ সাধারণত নিজের সক্ষমতা, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে একটি পথ বেছে নেয়।

ইসলাম মানবচরিত্রের এ স্বাভাবিক প্রবণতাকে উপেক্ষা করেনি; বরং বৈধতার সীমার মধ্যে থেকে তুলনামূলক সহজ ও স্বস্তিদায়ক বিকল্প গ্রহণ করার এক অনন্য জীবনাদর্শ রেখে গেছেন মুহাম্মদ (সা.)।

নবীজির জীবনদর্শন ও ভারসাম্য

হাদিসে এসেছে, ‘নবীজিকে যখনই দুটি বিষয়ের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো, তখন তিনি উভয়ের মধ্য থেকে তুলনামূলক সহজটিই গ্রহণ করতেন, যদি না তাতে কোনো পাপের উপাদান পাওয়া যায়। আর যদি তাতে পাপের কোনো বিষয় থাকত, তবে তিনি তা থেকে সর্বাধিক দূরে অবস্থান করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮৬)

এ হাদিসে নবীর জীবনাদর্শের এক গভীর বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। নবীজির এই সহজ বিকল্প গ্রহণ কোনো অলসতা, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল কিংবা নফসের তাড়না ছিল না; বরং শরিয়তসম্মত একাধিক বৈধ উপায়ের মধ্যে কম কষ্টের ও বেশি কল্যাণকর পথ বেছে নেওয়াই ছিল তাঁর স্বভাবজাত সুন্নাহ।

.
আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের জন্য কোনো কঠোরতা চান না।
সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫
.স্ক্রিনের আলোয় নিভে যাওয়া একটি সুন্নত.

পাপ পরিহারের ক্ষেত্রে আপসহীনতা

হাদিসটির দ্বিতীয় অংশ মূলত পুরো জীবনাচরণের ভারসাম্য নিশ্চিত করে। সহজ বিষয় পছন্দের অর্থ কখনোই শরিয়তের সীমানা লঙ্ঘন বা কোনো আপসকামী মানসিকতা ছিল না। বৈধ ক্ষেত্রে তিনি যেমন সহজটি গ্রহণ করতেন, তেমনি যেখানে সামান্যতম গুনাহ বা অন্যায়ের সংশয় থাকত, সেখানে তিনি পাহাড়ের মতো অবিচল ও কঠোর অবস্থান নিতেন।

আজকের আধুনিক জীবনে এ ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অনেকে মুবাহ বা বৈধ বিষয়ে অযথা অতিরিক্ত কঠোরতা দেখিয়ে জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে, আবার স্পষ্ট নিষিদ্ধ বা হারাম কাজের বেলায় নানা মনগড়া ব্যাখ্যা ও অজুহাত খোঁজে। 

অথচ সুন্নাহর শিক্ষা হলো যেখানে আল্লাহ ছাড় দিয়েছেন, সেখানে স্বস্তি গ্রহণ করা আর যেখানে নিষেধ করেছেন, সেখানে আত্মস্বার্থ বা সামাজিক প্রথার অজুহাত না তুলে সম্পূর্ণ বিরত থাকা।

ইসলামি বিধানের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা

ইসলাম মানুষের ওপর এমন কোনো বিধান চাপিয়ে দেয়নি, যা তার স্বাভাবিক মানবীয় সামর্থ্যের অতীত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকেই তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)

অন্য আয়াতে শরিয়তের মূল দর্শন স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ সেটাই চান, তোমাদের জন্য কোনো কঠোরতা চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)

ইবাদত, মুআমালাত (লেনদেন), পরিবার কিংবা সামাজিক আচরণ—সর্বত্রই ইসলাম মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি ও সামর্থ্যকে বিবেচনায় রেখেছে। অসুস্থ বা মুসাফিরের জন্য নামাজ ও রোজায় ছাড়, দাঁড়িয়ে নামাজে অক্ষম ব্যক্তির জন্য বসে আদায়ের অনুমতি—এসবই শরিয়তের সহজীকরণ নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ।

.দোয়ার আয়াত শুনে সিজদা করা কি সুন্নত.
দাওয়াতের ভাষা হতে হবে হৃদয়গ্রাহী, শিক্ষাদান হবে পর্যায়ক্রমিক এবং নসিহত হবে মানুষের বাস্তব সক্ষমতা উপলব্ধি করে।
.

সহজ বিকল্প বনাম প্রবৃত্তির দাসত্ব

এখানে একটি সূক্ষ্ম ধর্মীয় সীমারেখা মনে রাখা প্রয়োজন। সহজ পন্থা অবলম্বনের অর্থ কখনোই নিজের নফস বা কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব নয়। মানুষের প্রবৃত্তি অনেক সময় এমন হারাম বা ক্ষতিকর পথে টানে, যা সাময়িকভাবে আরামদায়ক মনে হলেও পরকালে ধ্বংস ডেকে আনে।

দুটি বৈধ বিকল্পের মধ্যে সহজটি বেছে নেওয়া প্রশংসনীয় সুন্নত; কিন্তু কোনো হারাম বিষয়কে নিজের সুবিধার জন্য সহজ বানিয়ে নেওয়া সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি।

মুমিন নিজের প্রতিটি পছন্দকে কোরআন ও সুন্নাহর মানদণ্ডে যাচাই করবেন। শরিয়ত যেখানে বৈধতার সুযোগ (রুখসত) রেখেছে, সেখানে অযথা অতিরিক্ত কৃচ্ছ্রসাধন বা বাড়াবাড়ি করাও সুন্নাহসম্মত নয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শারহি সহিহিল বুখারি, ১/২০৩, আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দামেস্ক, ১৪৩৪ হিজরি)

শিক্ষাদানে স্বস্তির পরিসর

শিক্ষক, অভিভাবক ও ইসলাম প্রচারকদের (দাঈ) জন্য এই সুন্নাহে রয়েছে অপরিহার্য দিকনির্দেশনা। মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে গিয়ে সাধ্যের অতীত চাপ প্রয়োগ করলে মানুষ সংশোধনের বদলে ইসলাম থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

দাওয়াতের ভাষা হতে হবে হৃদয়গ্রাহী, শিক্ষাদান হবে পর্যায়ক্রমিক এবং নসিহত হবে মানুষের বাস্তব সক্ষমতা উপলব্ধি করে।

রাসুল (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা মানুষের জন্য সহজ করো, কঠিন কোরো না; সুসংবাদ দাও, বিমুখ ও আতঙ্কিত কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১২৫)

পার্থিব জীবন নানা টানাপোড়েন, দায়িত্ব ও পরীক্ষায় পূর্ণ, তাই ধর্মচর্চায় মনগড়া কঠোরতার বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বৈধ ক্ষেত্রে সহজ বিকল্প গ্রহণ এবং পাপের ক্ষেত্রে আপসহীন দূরত্ব বজায় রাখা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই প্রস্ফুটিত হয় ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্য।

  • নাহিদা সুলতানা: আলেমা ও প্রাবন্ধিক

    [email protected]

.রাতে ঘুমানোর সুন্নত সময় কখন