যুক্তরাজ্যের রান্নাবিষয়ক রিয়েলিটি টিভি শো ‘মাস্টারশেফ ইউকে’র ২২তম আসরে প্রতিযোগিতা করে সেমিফাইনালে উঠেছিলেন সাবিনা খান। বিচারক ও খাদ্যসমালোচকদের প্রশংসা পেয়েছে তাঁর তৈরি ‘সালাদ অব হারমোনি’। ১৮ আগস্ট দেশে এসেছেন তিনি। সুরাইয়া সরওয়ার-এর সঙ্গে আড্ডায় উঠে এল তাঁর মাস্টারশেফ হয়ে ওঠার গল্প‘মাস্টারশেফ ইউকে’তে অংশ নেওয়ার শুরুর গল্পটা শুনতে চাই?
.‘মাস্টারশেফ ইউকে’তে অংশ নেওয়ার শুরুর গল্পটা শুনতে চাই?
.১৬ বছর আগে একবার মাস্টারশেফে আবেদন করেছিলাম। তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলাম। শুটিংয়ের সময় সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা ছিল বলে সেবার প্রতিযোগিতায় অংশ নিইনি। পরে নানা ব্যস্ততায় সেই স্বপ্নটা অনেকটা চাপা পড়ে যায়। এত বছর পর আমার ছেলে আমাকে আবেদন করতে উৎসাহ দেয়।
.কী কী ধাপ পেরোতে হয়েছে?
প্রথমে অনলাইনে আবেদন করি, সেখানে ১৫-২০টা প্রশ্ন ছিল। ৩০ সেকেন্ডের একটা খাবারের ভিডিও-ও বানাতে হয়েছিল। ভিডিওটি বানাতে আমার মেয়ে আমাকে সাহায্য করেছিল। প্রথম পর্যায়ে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ আবেদন করে। সেখান থেকে ২ হাজারের মতো মানুষকে ইন্টারভিউয়ের জন্য ডাকা হয়।
এরপর অনলাইন ইন্টারভিউ, স্টুডিওতে গিয়ে রান্না করাসহ আরও কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ২০০ জনের মধ্য থেকে ৪৮ জনকে নির্বাচিত করা হয়। শুরুর সময় ভাবতাম, একটা এপিসোড পার হতে পারলেই আমি খুশি।
এরপর এক এক রাউন্ড পার করতে থাকলাম। নকআউট রাউন্ডে একটি বিখ্যাত রেস্তোরাঁয় রান্না করার অভিজ্ঞতা হয়। সেমিফাইনালে আমাদের ১০০ জনের জন্য রান্না করতে হয়েছিল। সেই পর্যন্ত যেতে পেরেই আমি নিজের ওপর খুব গর্বিত ছিলাম।
পরিবারের সমর্থন কতটা পেয়েছেন?
.আমার পরিবার সব সময় আমার পাশে ছিল। আমার মা-বাবা, স্বামী ও সন্তানেরা প্রতিটি পদক্ষেপে আমাকে সমর্থন করেছে। এখন তো মনে হয় আমার ছেলে-মেয়েই যেন আমার মা, আর আমি ওদের সন্তান! ওরা সব সময় বলে, ‘মা, তুমি ভালোমতো রান্না করো।’
.মাস্টারশেফে রান্না করা বিশেষ কোনো রেসিপির কথা কি মনে পড়ে?
সে সময় বিভিন্ন দেশে নানা বিশৃঙ্খলা চলছিল। আমি নিজে যেহেতু এসব বিশৃঙ্খলা থামাতে পারব না, ভাবলাম বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিয়ে কিছু একটা সালাদ বানাই। সালাদটি বানানোর সময় ইরানের নানা সমস্যা, বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ পৃথিবীর অনেক অস্থিরতার কথা মনে হচ্ছিল। তখন আমার ভেতর থেকে মনে হলো, এমন একটি সালাদ বানাব, যা সারা বিশ্বে শান্তির বার্তা দেবে। সালাদটির নাম দিই ‘সালাদ অব হারমোনি (ঐক্যের সালাদ)’।
ইরানের অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফালাফেল (মধ্যপ্রাচ্যের একটি জনপ্রিয় খাবার) তৈরি করেছিলাম। ফ্রান্সের রসুনের কনফি করে ফ্রেঞ্চ স্টাইলের ড্রেসিং বানিয়েছিলাম। আর বাংলাদেশের ছোলা ও মুড়ি ব্যবহার করেছিলাম। মুরগির চামড়া ওভেনে লাল মরিচ দিয়ে মুচমুচে করে চিপসের মতো করে তৈরি করেছিলাম। কোয়েল পাখির ডিম বিটরুটে রাঙিয়ে পরিবেশন করেছিলাম। চেয়েছিলাম খাওয়ার পর যেন মনের মধ্যে প্রশান্তি কাজ করে।
কোয়ার্টার ফাইনালের আগের পর্বে চাটনির সঙ্গে পেঁয়াজু পরিবেশন করেছিলাম। বিচারকেরা আমাদের পেঁয়াজু খেয়ে খুব খুশি। তাঁরা এর নাম দিয়েছিলেন—‘বুলেটস অব জয়’।
রান্নার প্রতি আগ্রহ কবে থেকে?
আমার ছোটবেলা দেশেই কেটেছে। ১০ বছর বয়সে প্রতিবেশী বন্ধুদের সঙ্গে বাগানে মাটির পাতিল বানিয়ে মাটির চুলায় রান্না করতাম। চিংড়ি, ভাত, ডাল রান্না করতাম। তারপর সবাই মিলে খেতাম। একবার একটা গাছের পাতায় আমরা খাবার রেখেছিলাম। সেই খাবার খেয়ে সবার গলা খুসখুস করতে শুরু করল। আমাদের শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছিল।
রান্নায় আপনার অনুপ্রেরণা কে?
আমার একমাত্র অনুপ্রেরণা আমার মা (মুনাওয়ার শফিক)। আমাদের বাড়িতে বাইরের খাবার খাওয়া মানা ছিল। ঘরেই বার্গার, কাবাব, বিরিয়ানি, পিৎজা, ডোনাট, পেস্ট্রি ও চায়নিজ খাবার বানিয়ে খাওয়াতেন মা। দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে এসব খাবারের স্বাদ নেওয়ার আনন্দই আমাকে রান্নায় অনুপ্রাণিত করেছে। ঘরে বসে রান্নার বিভিন্ন টেলিভিশন শো দেখতাম। সেখান থেকে সস ও খাবার তৈরির নানা কৌশল শিখেছি। আমার স্বামী পাকিস্তানের নাগরিক। তাই বাড়িতে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি মিশ্র খাবারের চল আছে। তবে রান্নায় সব সময় বাংলাদেশি শর্ষের তেল, পাঁচফোড়ন ও মাছের ব্যবহার পছন্দ করি।
রান্নাবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ কি কখনো নেওয়া হয়েছে?
.না, রান্নার ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা পেশাদার প্রশিক্ষণ নিইনি। তবে খাবার নিয়ে গবেষণা করতে ভালোবাসি। ফরাসি ডেজার্ট বা ফরাসি রন্ধনশিল্প নিয়ে একটি প্রশিক্ষণ নেওয়ার ইচ্ছে আছে।
.আপনি তো পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক। সাসটেইনেবিলিটি বিষয়টা রান্নায় কীভাবে আনা যায়?
পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক হিসেবে একটি পরিবেশবাদী সংস্থায় সপ্তাহে এক দিন কাজ করছি। এই পরিবেশগত কাজের প্রভাব আমার রান্নাতেও থাকে। রান্নায় কোনো কিছু সহজে নষ্ট বা অপচয় করি না। যেমন মাছের সালাদ তৈরির পর মাছের কাঁটা ফেলে দিই না। সেগুলো থেকে স্টক তৈরি করে স্যুপ বা অন্য খাবারে ব্যবহার করি।
খাবার নিয়ে এখন কী করছেন?
যুক্তরাজ্যে প্রতি মাসে ‘সাপার ক্লাব’ করি। সেখানে ১২ থেকে ২৫ জন অতিথি আসেন। তাঁদের জন্য ৬-৭ পদের খাবার পরিবেশন করা হয়। প্রত্যেকের খরচ পড়ে প্রায় ৭০ পাউন্ড। আগামী মাসে জেনেভায় একটি সাপার ক্লাব পরিচালনার আমন্ত্রণ পেয়েছি। ইনস্টাগ্রামে ‘সাবিনাস ফ্লেভার ল্যাব’ নামের পেজে রেসিপি দিয়ে থাকি। এ ছাড়া বিভিন্ন ফুড ফেস্টিভ্যালে অংশ নিই।
রান্না নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমার মূল পরিকল্পনা হলো বাংলাদেশের খাবারকে বিশ্বের বড় বড় প্ল্যাটফর্মে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরা। বিদেশিদের কাছে বাংলাদেশের খাবারের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। ভবিষ্যতে রান্না নিয়ে একটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করতে চাই। বিশেষ করে অন্য নারীদের উদ্যোক্তা বা রন্ধনশিল্পী হওয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ দিতে চাই। আর এমন একটি বই লিখতে চাই, যা শুধু সাধারণ রেসিপির বই হবে না। সেখানে আমাদের রান্নার উপাদানের পাশাপাশি খাবারটির ইতিহাসও বিস্তারিত থাকবে।