কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা ও সামরিক দিক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও বড় ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। সীমিত সংখ্যক ভাষায় প্রশিক্ষিত এবং অল্প কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন এই মডেলগুলো উন্নয়নশীল দেশ ও ছোট ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীকে বড় ধরনের অসুবিধার মুখে ফেলছে।

পৃথিবীতে সাত হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত থাকলেও অধিকাংশ বড় ভাষা মডেল কেবল প্রায় ১০০টি ভাষায় প্রশিক্ষিত। এর মধ্যে ইংরেজি, চীনা, স্প্যানিশ, ফরাসি ও জার্মান—এই পাঁচটি উচ্চসম্পদসম্পন্ন ভাষার তথ্যই প্রশিক্ষণ উপাত্তের প্রায় পুরোটাই দখল করে আছে। অথচ বিশ্বের মাত্র ৪০ কোটি মানুষের মাতৃভাষা ইংরেজি এবং পৃথিবীর মাত্র ২৫ শতাংশ মানুষের প্রথম ভাষা এই পাঁচটির কোনো একটি। ফলে বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ ভাষাগত কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রধান সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

২০২২ সালের নভেম্বরে ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি প্রকাশ করার পর থেকে প্রযুক্তি খাতের নেতা ও নীতিনির্ধারকেরা সমাজ উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্ভাবনার কথা বলে আসছেন। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় পরিবর্তন, উৎপাদনশীলতা ও মানুষের আয় বৃদ্ধি—সব ক্ষেত্রেই এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু এর সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। এই বৈষম্যের স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। স্বল্প মেয়াদে অনেক জনগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং ভাষাগত বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে পারে। এখানে আরেকটি তিক্ত বিদ্রূপ রয়েছে। ধনী দেশগুলো দ্রুত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ করছে এবং আরও শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামোসহ বিশাল ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য চিপের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় স্মার্টফোনের দামও বেড়েছে। ফলে লাখো মানুষের জন্য স্মার্টফোন কেনা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং উন্নয়নশীল দেশের মানুষের ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবিধা পাওয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বড় ভাষা মডেলগুলোকে স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তা না হলে জনগোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব শব্দভান্ডার ও ভাষাগত ঐতিহ্য হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। ইতিহাসের বড় ঘটনা, ব্যাপক জনগোষ্ঠীর স্থানান্তর এবং রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভাষার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে। ভাষাগত বৈচিত্র্যের অভাব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারও ধীর করতে পারে। পেরুতে ডিজিটাল আর্থিক সেবা কার্যকর করতে হলে সাধারণ মানুষ যেভাবে কথা বলে, সেই স্থানীয় ও কথ্য ভাষার ধরন বুঝতে হবে। আবার ভিয়েতনামে কার্যকর অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা দিতে হলে এমন স্পষ্ট যোগাযোগ প্রয়োজন, যা স্থানীয় বা মাতৃভাষাভিত্তিক মডেলই ভালোভাবে দিতে পারে।

স্থানীয় ভাষাভিত্তিক মডেল তৈরিতে মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তাদের বিপুলসংখ্যক সফটওয়্যার উন্নয়নকারী ও ব্যাপক তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা আছে। তারা সরকার ও জনগণের কাছে পরিচিত ও বিশ্বস্ত অংশীদারও। ছোট বা সংখ্যালঘু ভাষার জন্য বড় ভাষা মডেল তৈরির অন্যতম প্রধান বাধা প্রশিক্ষণ উপাত্তের অভাব। অথচ সরকারগুলোর কাছে বিপুল তথ্য রয়েছে, যার অনেকটাই সংবেদনশীল ও গোপনীয়। এ কারণে সরকার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান কিয়িভস্টার দেশটির ডিজিটাল রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বে দেশের প্রথম জাতীয় বড় ভাষা মডেল তৈরি করছে। এতে ইউক্রেনীয় ভাষার পাশাপাশি রুশ, বুলগেরীয় ও ক্রিমিয়ান তাতার ভাষাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ইউক্রেনের অনেক সাহিত্য রুশ শাসনামলে লেখা হওয়ায় সেগুলোর সাংস্কৃতিক উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এ কারণে চারটি পরামর্শক কমিটি মডেলটির প্রযুক্তিগত, আইনগত, সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও ভাষাগত বিষয় তদারক করেছে। প্রশিক্ষণ উপাত্ত হিসেবে কোন লেখা ব্যবহার হ করাবে, সে বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক ছিল।

আমি যে গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক, সেই সংগঠনও সাব-সাহারা আফ্রিকায় একই ধরনের কৌশল গ্রহণ করেছে। আফ্রিকান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাষা মডেল প্রকল্পের আওতায় নাইজেরিয়া, মাদাগাস্কার, টোগো ও কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসহ বিভিন্ন দেশের ভাষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই উদ্যোগে আফ্রিকার ছয়টি বড় মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠান—এয়ারটেল, অ্যাক্সিয়ান টেলিকম, ইথিও টেলিকম, এমটিএন, অরেঞ্জ ও ভোডাকম—একসঙ্গে কাজ করছে। অন্যান্য টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজও এতে যুক্ত। লক্ষ্য হলো আফ্রিকার ভাষার জন্য এমন মডেল তৈরি করা, যা ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ইতিবাচক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ফল বয়ে আনতে পারে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেও সংগঠনটি কাজ করছে। যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের অর্থায়নে ইমার্জিংটেক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রথম দফায় টুমএআই মরক্কোর স্থানীয় কথ্য ভাষায় কণ্ঠভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করছে, যাতে কম শিক্ষিত গ্রামীণ মানুষ সহজ কথ্য নির্দেশনায় ডিজিটাল ও আর্থিক সেবা ব্যবহার করতে পারেন। ওয়াইজইয়াক নেপালের ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে একাধিক ভাষা মিলিয়ে কথোপকথনভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করছে।

বিশ্ব এখন শুধু নির্দেশনা বা প্রম্পটনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে নেই; ধীরে ধীরে এজেন্টিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দিকে এগোচ্ছে। এজেন্টিক বলতে এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বোঝায়, যা শুধু নির্দেশনা অনুযায়ী উত্তর দেয় না, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে নিজে পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে পারে। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো ডিজিটাল সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে। মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য এগুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হবে। উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক মডেল থেকেও প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পাচ্ছে। স্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ইতিবাচক চক্র তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে দক্ষ প্রযুক্তিকর্মী তৈরি হবে, যা ডিজিটাল স্বাধীনতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এজেন্টিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে নিজেদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন শক্তিশালী করতে হবে। এ জন্য সফটওয়্যার ডেভেলপার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সমাজের চাহিদা অনুযায়ী সংখ্যালঘু ভাষাভিত্তিক মডেল তৈরি জরুরি।

বিবেক বদ্রিনাথ গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ।