নেপাল-তিব্বত সীমান্তে সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যায় শত শত মানুষ নিহত হয়েছেন এবং এখনও এক হাজারের বেশি ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, লাংটাং-লিরুং পর্বতমালায় হিমবাহ ধস পড়ার কারণেই এই ভয়াবহ দুর্যোগ ঘটেছে, যা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
ইউনিভার্সিটি অব লিডসের হিমবাহ বন্যাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জোনাথন ক্যারাইভিক জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পাহাড়ি অঞ্চলের তাপমাত্রা বাড়ছে, যার প্রভাবে পারমাফ্রস্ট ও হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে। হিমবাহের বরফ গলে ভিত্তিমূলে বিশাল হ্রদ তৈরি হয়, যা একটি পাতলা ও অস্থিতিশীল প্রাকৃতিক বাঁধ দ্বারা আবদ্ধ থাকে। উষ্ণতা বৃদ্ধি বা পাহাড়ের ধসে সেই বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও বরফ নিচের জনবসতিতে নামে। এতে চেইন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। নেপালের ঘটনায়ও পাথর ও হিমবাহ ধসে লেন্দে খোলা নদী সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছিল, যা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করে।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মানুষ এমন বিপজ্জনক এলাকায় বসবাস করছেন, যেখানে হিমবাহজনিত বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয়, কারাকোরাম, হিন্দুকুশ ও আশপাশের পর্বতমালায় এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। দ্রুত উষ্ণায়ন, গলিত পানির হ্রদ বৃদ্ধি এবং পৃথিবীর অন্যতম খাড়া পাহাড়ি ঢালের কারণে হাই মাউন্টেন এশিয়া বা উচ্চ এশীয় অঞ্চলগুলো চরম বিপদের মুখে রয়েছে। তবে শুধু এশিয়াই নয়, উত্তর আমেরিকা (বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ও কানাডা), আল্পস পর্বতমালা এবং বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ অঞ্চলেও এই ঝুঁকি রয়েছে। গবেষকদের মতে, আন্দিজ অঞ্চলের বরফ গলা পানিতে বড় শহরগুলোর পানির চাহিদা মেটে, যা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
গ্লোবাল গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা হিমবাহের হ্রদের উপচে পড়া বন্যার ঝুঁকিতে থাকা শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, পাকিস্তান, পেরু, কানাডা, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চিলি, ইতালি, নেপাল ও কলম্বিয়া। ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্যার সুনির্দিষ্ট সময় বা স্থান আগাম বলা কঠিন হলেও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে চলেছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।