মাদারীপুরে গত ১৩ বছরে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে ৬৯০টি মামলা দায়ের হলেও দালালচক্রের কার্যক্রম থামেনি। ইতালিসহ ইউরোপের স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের লিবিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। মামলা হলেও আসামি ধরাচ্ছে না পুলিশ, আর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নিখোঁজ স্বজন ও মুক্তিপণের চাপে দিন কাটাচ্ছে।

সদর উপজেলার পাঁচখোলা ইউনিয়নের জাজিরা গ্রামের আবুলের ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সোনা মিয়া ঘরামীর মাধ্যমে ২০ লাখ টাকায় বিদেশযাত্রার চুক্তি হলেও তাকে ইতালির বদলে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে নির্যাতনের পাশাপাশি পরিবার থেকে আরও ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। ২২ দিন নিখোঁজ থাকার পর সোনা মিয়া ঘরামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনও কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০ হাজারের বেশি তরুণ উন্নত জীবনের আশায় দালালের প্রলোভনে বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছেন। কেউ ফিরছেন নিঃস্ব হয়ে, কেউ বন্দিদশায় আছেন, আবার কারও পরিবার প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে। সদর উপজেলার টুবিয়া গ্রামে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ইতালির প্রলোভন দেখিয়ে প্রায় অর্ধশত যুবককে লিবিয়ায় নেওয়া হয়েছে। আধাকোটি টাকা খরচ করেও তাদের মুক্তি মেলেনি। এর মধ্যে মোস্তফা গাজী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

বোয়ালিয়া গ্রামের মোক্তার হোসেন ব্যাপারীর ছেলে সামি ব্যাপারী, দক্ষিণ দুধখালী গ্রামের সুক্কুর আলী ফকিরের ছেলে কামরুজ্জামান ফকির এবং ছোট দুধখালী গ্রামের করিম হাওলাদারের ছেলে ইব্রাহীম হাওলাদারসহ আরও অর্ধসহস্র তরুণ লিবিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার রাঘদী ইউনিয়নের বড়দিয়া গ্রামের ইলিয়াস ফকিরের মাধ্যমে তারা বিদেশে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। মামলা হলেও অভিযুক্ত ইলিয়াস এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।

পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৩ সাল থেকে মাদারীপুরে মানবপাচার প্রতিরোধ আইনে ৬৯০টি মামলায় প্রায় এক হাজার ৩০০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬৫০ জনকে। জেলা পুলিশের মনিটরিং সেলে বর্তমানে ২৯০টি মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। পাশাপাশি সিআইডির কাছে আরও আটটি মামলা চলছে। তবে মামলার সংখ্যার পাশাপাশি একটি চাঞ্চল্যকর তথ্যও পুলিশের দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে। দায়ের হওয়া মামলাগুলোর একটি বড় অংশে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। প্রায় ৪০০ মামলাকে ‘ভুয়া’ হিসেবে উল্লেখ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ১ হাজার ১০০ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পুলিশ।

মামলার সংখ্যা বাড়লেও তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকৃত ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা কেন দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। সামি বেপারীর পরিবারের এক সদস্য বলেন, বিদেশে পাঠানোর কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছিল। এখন ছেলেটা কোথায় আছে, কেমন আছে—আমরা ঠিকমতো কিছুই জানতে পারছি না। দালালের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমরা চাই, দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হোক এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হোক। কামরুজ্জামান ফকিরের পরিবারের ভাষ্য, বিদেশে যাওয়ার পর থেকেই তাদের দুশ্চিন্তা শুরু হয়। একসময় যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা বুঝতে পারেন, স্বাভাবিকভাবে বিদেশে গিয়ে কাজ করার পরিবর্তে তিনি বিপদের মধ্যে পড়েছেন। পরিবারের দাবি, আমরা ঋণ করে, জমিজমা বিক্রি করে টাকা দিয়েছি। এখন ছেলেকে ফেরত পাওয়াই আমাদের একমাত্র চাওয়া। যারা এই কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। ইব্রাহীম হাওলাদারের স্বজনদেরও একই অভিযোগ। তাদের ভাষায়, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন এখন পরিবারের কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেকারত্ব, পরিবারের আর্থিক সংকট এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় অনেক তরুণ বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ সুযোগ কাজে লাগায় দালালচক্র। প্রথমে ইতালি, ইউরোপ কিংবা উন্নত কোনো দেশে চাকরির প্রলোভন দেখানো হয়। পরে নানা অজুহাতে গন্তব্য পরিবর্তন করে তাদের নেওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে পৌঁছানোর পর শুরু হয় আরেক দফা ভোগান্তি। অনেকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়, কারও ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে, আবার কাউকে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। স্থানীয় লুৎফর, মামুন, মোকলেস, মজিবর ঢালি, দুলুফা, রেহেনাসহ বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে ছেলেরা দালালের কথাই বিশ্বাস করে। পরিবারও মনে করে, কয়েক বছর কষ্ট করলে ছেলে ভালো আয় করবে। কিন্তু পরে যখন লিবিয়া থেকে নির্যাতনের খবর আসে, তখন পরিবারগুলোর আর কিছু করার থাকে না।

মাদারীপুর সদর উপজেলার টুবিয়া এলাকার নিখোঁজ মোস্তফা হাওলাদারের মা ডালিয়া বেগম বলেন, আমার ছেলেকে ৫৫ লাখ টাকা দিয়েও এখনও ফেরত পাইনি। স্থানীয় দালাল মামুনের সাথে চুক্তি হয়। তিনি আমার ছেলেকে কোথায় রেখেছেন আমি জানি না। আমি আমার ছেলের সন্ধান চাই আর দালালের বিচার চাই। তবে স্থানীয় দালাল মামুন ব্যাপারীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারা নিজেরাই আমাদের কাছে আসে বিদেশে যাওয়ার জন্য। আমরা তাদেরকে কোনো প্রলোভন দেখাই না।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, মানবপাচারের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী মামলা ও তদন্ত করা হয়। কোনো অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না পাওয়া গেলে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তিনি আরও বলেন, বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদিত ও বৈধ মাধ্যম ব্যবহার করা জরুরি। দালালের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ পথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বন্ধে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক মর্জিনা আক্তার বলেন, মানবপাচার প্রতিরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাতে হবে। পাশাপাশি বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।