বাংলা সাহিত্যের আকাশে কাজী নজরুল ইসলাম এক চিরভাস্বর ধ্রুবতারা। তিনি শুধুই এক কবি নন; তিনি আমাদের তারুণ্যের প্রতীক, দ্রোহের বহ্নিশিখা এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিষাদের ঘন কালো মেঘ তাঁকে ঘিরে রাখলেও, তিনি সৃষ্টি করেছেন আনন্দের ফলগুধারা, সাম্যের বাণী এবং অসাম্প্রদায়িকতার অমর বার্তা। তবে কবির জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পরও তাঁর স্মৃতিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ও অবহেলার যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আজও ইতিহাসের অন্যতম চর্চিত বিষয়। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে কবির একটি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশের পেছনের ঘটনাটি কেবল কোনো ফিলাটেলিক ইতিহাস নয়, বরং তা তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের এক অন্যতম প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

দুঃখের আবর্তে বেড়ে ওঠা ‘দুখু মিয়া’

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ সালের ২৪ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। অতিদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া এই কবির শৈশব নামটিই ছিল তাঁর জীবনের সঙ্গে রূপক হয়ে টিকে থাকা—‘দুখু মিয়া’।

মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবার অকালমৃত্যু নজরুলকে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। শৈশবের স্বাভাবিক চপলতা ছেড়ে খুব অল্প বয়সেই তাঁকে সংসারের জোয়াল কাঁধে নিতে হয়। গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন-মাধ্যমিক পাস করার পর সেই মক্তবেই তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সঙ্গে পরিবারের সামান্য আয়ের তাগিদে স্থানীয় মাজারের খাদেম, কবর সেবক এবং মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু এই বাঁধাধরা জীবন নজরুলের অদম্য সৃষ্টিশীল সত্তাকে আটকে রাখতে পারেনি। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি যোগ দেন আঞ্চলিক নাট্যদল ‘লেটো দলে’। লেটো দলের জন্য পালাগান, গান ও কবিতা রচনার মধ্য দিয়েই তাঁর ভেতরের সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। পরবর্তী সময়ে রুটির দোকানে কাজ করা থেকে শুরু করে আসানসোলের সিয়ারসোল রাজবাড়ি স্কুলে পড়াশোনা—নজরুলের জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৭ সালে) নজরুল নাটকীয়ভাবে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ৪৯তম বাঙালি পল্টনের হাবিলদার হিসেবে করাচি ব্যারাকে দিন কাটান। বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তাঁর ইরাকে যাওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে আর যেতে হয়নি। তবে করাচি সেনানিবাসের এই জীবনই তাঁর ভেতরের সাহিত্যিক সুপ্ত বাসনাকে বিস্ফোরণের রূপ দেয়।

.

সাহিত্যজগতে ধূমকেতুর আগমন ও সাফল্যের চরম শিখর

১৯২০ সালে করাচি সেনানিবাস ভেঙে দেওয়ার পর নজরুল সোজা চলে আসেন কলকাতায়। ১৯২০ থেকে ১৯৪২—এই দুই দশক ছিল বাংলা সাহিত্যের জন্য এক স্বর্ণযুগ, আর এর কেন্দ্রে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। কলকাতায় এসে তিনি পুরোদমে সাহিত্যচর্চা ও রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন।

নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, সুরকার ও সংগীতজ্ঞ। ১৯২১ সালে তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ প্রকাশিত হওয়ার পর পুরো বাংলা সাহিত্যজগতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। তিনি এক রাতে রচিত এই কবিতার মাধ্যমে নিজেকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অনায়াস উচ্চারণে তিনি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে লিখতে পারতেন:

‘...ভগবান-বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন।’

নজরুল কেবল দ্রোহের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন পরম প্রেমের ও সাম্যের কবি। ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি রচনা করেছেন অসামান্য সব সাহিত্যকর্ম। একজন মুসলিম হয়েও তিনি শত শত কালজয়ী শ্যামাসংগীত ও ভক্তিগীতি রচনা করেছেন, যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় ইসলামি গান ও কাওয়ালি ধারার প্রবর্তন করে তিনি মুসলিম সমাজকে সংগীতের মূলধারায় নিয়ে আসেন। তাঁর রচিত রোজা ও ঈদের গান—

‘ও মোর রমজানের এই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ...’

আজও বাঙালি মুসলিম সমাজে ঈদ উদ্‌যাপনের প্রধান সুরে পরিণত হয়ে আছে। ছেলে-বুড়ো সবার মন এই গান শুনলে আজও আনন্দে নেচে ওঠে।

.

ঐতিহাসিক বৈষম্য: ডাকটিকিটের আয়নায় ১৯৪৭-১৯৭১

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত—এই চব্বিশ বছরে তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোয় পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) কীভাবে সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়েছিল, তা ইতিহাসবিদদের অজানা নয়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বৈষম্যের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এই অবহেলা ছিল প্রবল।

তারই এক বড় প্রমাণ মেলে ফিলাটেলি বা ডাকটিকিট প্রকাশের পরিসংখ্যানে। এই চব্বিশ বছরে পাকিস্তান পোস্টাল সার্ভিস সর্বমোট ২৯৬টি স্মারক ও সাধারণ ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে মাত্র ৫১টি ডাকটিকিট ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইতিহাস, ঐতিহ্য বা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত!

পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী জাতীয় পর্যায়ের প্রতীক বা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সর্বদাই পূর্ব পাকিস্তানের গুণীজনদের উপেক্ষা করে এসেছে। পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র যে সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্বকে পশ্চিম পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত ডাকটিকিটের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল, তিনি হলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এবং সেই সিদ্ধান্তটিও নেওয়া হয়েছিল পাকিস্তান সৃষ্টির দীর্ঘ দুই দশক পর—১৯৬৮ সালে।

.

কেন এবং কীভাবে এল নজরুলের ডাকটিকিট

পাকিস্তানের ডাকটিকিটের ইতিহাসে নজরুলের আগমন কিন্তু খুব স্বাভাবিক বা শ্রদ্ধাপূর্ণ কোনো প্রক্রিয়ায় হয়নি; বরং এটি ছিল রাজনৈতিক চাপ ও সমালোচনার মুখ রক্ষার এক কৌশল।

১৯৫৮ সালে আল্লামা ইকবালের ২০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে পাকিস্তান সরকার এক সেট বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এর ৯ বছর পর, ১৯৬৭ সালে কবি ইকবালের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আবারও বিপুল সাড়ম্বরে আরেক সেট ডাকটিকিট বাজারে আনা হয়।

পরপর ইকবালকে নিয়ে এই আয়োজনের পর পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মহল তীব্র প্রতিবাদ জানায়। প্রশ্ন ওঠে—পাকিস্তান কি কেবল আল্লামা ইকবালের? পাকিস্তানে কি আর কোনো কবি-সাহিত্যিক নেই? বাঙালিরা কি তবে সাহিত্য সাধনা করে না?

এই জোরালো সমালোচনার মুখে পড়ে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় ডাক বিভাগ তড়িঘড়ি করে একজন বাঙালি কবিকে নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশের পরিকল্পনা করতে বাধ্য হয়। আর সেই বাঙালি কবি হিসেবে বেছে নেওয়া হয় কাজী নজরুল ইসলামকে।

.

নজরুলকে বেছে নেওয়ার পেছনে একাধিক ব্যবহারিক ও রাজনৈতিক কারণ ছিল:

করাচি অধ্যায়: যদিও নজরুল জন্মসূত্রে ভারতীয় এবং সে সময়ও (১৯৬৮ সালে) তিনি ভারতেই বসবাস করছিলেন, কিন্তু সেনাজীবনে তিনি পাকিস্তানের করাচিতে কর্মরত ছিলেন।

সরকারি ভাতা ও সম্পর্ক: ১৯৪২ সালে কবি এক রহস্যময় দুরারোগ্য ব্যাধিতে (পিকস ডিজিজ) আক্রান্ত হয়ে সম্পূর্ণ বাক্‌শক্তি ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। কবির উপার্জনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে পরিবার তীব্র অর্থকষ্টে পড়ে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান সরকার ও পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কবির এই অসহায় অবস্থা বিবেচনা করে একটি স্থায়ী ‘সাহিত্যিক চিকিৎসা ভাতা’ বা পেনশন মঞ্জুর করেছিল।

এসব যোগসূত্র মিলিয়ে পাকিস্তানি ডাক বিভাগের কাছে নজরুলের চেয়ে ‘নিরাপদ’ ও ‘উপযুক্ত’ বাঙালি ব্যক্তিত্ব আর কেউ ছিল না।

.

ডাকটিকিটের ভুল, অবহেলা ও বিকৃতির ইতিহাস

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের চরম অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার নজির হয়ে দাঁড়ায়।

নজরুলের স্মরণে দুটি ডাকটিকিট নকশা করা হয়। নকশার মূল কনসেপ্ট একই ছিল—কবির একটি আবক্ষ ছবি, পাশে তাঁর বিখ্যাত কবিতার লাইন এবং ওপরে দুই লাইনে ইংরেজিতে লেখা কথা। ডাকটিকিট দুটি ভিন্ন রঙে ও মূল্যমানে ছাপানো হয়।

নকশা অনুযায়ী ওপরে লেখার কথা ছিল:

BIRTH ANNIVERSARY OF KAZI NAZRUL ISLAM

BORN 25TH MAY 1889

পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ মে, ১৯৬৮ সালে (কবির জন্মদিনে) ডাকটিকিট ও উদ্বোধনী খাম প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু প্রকাশের ঠিক শেষ মুহূর্তে গিয়ে কর্তৃপক্ষের খেয়াল হয় যে তারা কবি নজরুলের জন্মসালটাই ভুল ছেপেছে! নজরুলের প্রকৃত জন্মসাল ১৮৯৯ হলেও ডাকটিকিটে ছাপা হয়ে গেছে ১৮৮৯!

.

এই বিরাট ভুলের পর তড়িঘড়ি করে ডাকটিকিট প্রকাশ স্থগিত করা হয় এবং আগের ছাপানো সব ডাকটিকিট ও খাম বাতিল করে নতুন নকশার কাজ শুরু হয়।

কিন্তু জন্মদিনের এক মাস পর তো আর ‘জন্মবার্ষিকী’র ডাকটিকিট প্রকাশ করা যায় না! তাই এক মাস পিছিয়ে প্রকাশের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৫ জুন, ১৯৬৮। জন্মবার্ষিকীর লেখা বদলে তিন লাইনে নতুন লেখা যুক্ত করা হয়:

KAZI NAZRUL ISLAM

POET AND MUSICIAN

(b. 25TH MAY 1899)

ভুল কেবল জন্মসালেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আসল আঘাতটি এসেছিল কবির কবিতার লাইনে। নজরুল ছিলেন সাম্যের কবি। তাঁর বিখ্যাত ‘মানুষ’ কবিতার প্রথম দুই লাইন হলো:

‘গাহি সাম্যের গান—

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’

কিন্তু পাকিস্তানি ডাকটিকিটে কবির এই অমর পঙ্‌ক্তিটিকে বিকৃত করে লেখা হয়েছিল:

‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে নাহি কিছু বড়

নাহি কিছু মহীয়ান।’

.

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের এই চরম অবহেলা, অজ্ঞতা ও বিকৃতির এক ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে ১৯৬৮ সালের সেই বিতর্কিত ডাকটিকিট।

১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবি নজরুলকে ভারত থেকে সসম্মানে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং তাঁকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’র মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) এই মহান কবি ঢাকায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

যে নজরুল আজীবন জাতপাত, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ডাকটিকিটে তাঁর কবিতার বিকৃতি এবং ভুল তথ্য প্রকাশ প্রমাণ করে—শাসকেরা কখনোই বিপ্লবীর আদর্শকে ধারণ করতে পারেনি। তবু ইতিহাস কবিকেই তাঁর যোগ্য আসনে বসিয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের সেই বৈষম্যের স্মারকটি আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় নজরুলের সেই অমোঘ সত্য—সব শোষণের ও বৈষম্যের ঊর্ধ্বে শেষ পর্যন্ত জয় হয় মানুষের, জয় হয় সাম্যের।