সংরক্ষণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ৩৬০ টন ওজনের একটি বিশাল দুর্গ টেনে সরাতে হবে। শক্তিশালী ভূমিকম্পে দুর্গের পাথুরে প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাচীর ঠিক করতে দুর্গের মূল স্থাপনা না সরানোর বিকল্প নেই। কিন্তু এ জন্য যন্ত্রের ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এ বিবেচনায় সেটি দড়ি বেঁধে হাতে টেনে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়।

শুনতে বিস্ময়কর হলেও ঘটনাটি ঘটেছে জাপানের উত্তরাঞ্চলীয় আওমোরি এলাকায়। প্রায় ১ হাজার ৮০০ মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষকে এ কাজে সহায়তা করেন। তাঁরা হিরোসাকি দুর্গের ‘কিপ’ বা দুর্গের ভেতরের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারটির সঙ্গে ৩০ মিটার লম্বা বেশ কয়েকটি দড়ি বাঁধেন। এরপর তাঁরা পালাক্রমে দলবেঁধে দড়িগুলো ধরে টানতে থাকেন।

এভাবে গত শনিবার আস্ত স্থাপনাটি ১ দশমিক ১৩ মিটার ও রোববার আরও ১ দশমিক ০৯ মিটার সরানো হয়েছে।

.
হিরোসাকি দুর্গ জাপানে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ‘সাংস্কৃতিক সম্পদ’। ফলে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার পরিবর্তে কর্মকর্তারা ‘হিকিয়া’ নামের প্রাচীন একটি জাপানি কৌশল ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতিতে ভবন বা স্থাপনাকে রোলার কিংবা রেলের ওপর রেখে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়।
.

এর আগে সংস্কারকাজের জন্য দুর্গের ‘কিপ’ বা প্রধান টাওয়ারটি ২০১৫ সালে সেটির মূল অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যাতে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত দুর্গের প্রাচীরটি মেরামতে কর্মীরা প্রয়োজনীয় জায়গা পান। দুর্গের প্রাচীরের পুনর্নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এখন সেটির ‘কিপ’ আগের জায়গায় ফেরানোর পালা।

হিরোসাকি দুর্গ জাপানে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত ‘সাংস্কৃতিক সম্পদ’। ফলে স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার পরিবর্তে কর্মকর্তারা ‘হিকিয়া’ নামের প্রাচীন একটি জাপানি কৌশল ব্যবহার করেন। এ পদ্ধতিতে ভবন বা স্থাপনাকে রোলার কিংবা রেলের ওপর রেখে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়।

জাপানে একসময় হিকিয়া পদ্ধতি মূলত নগর উন্নয়ন, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং অন্যান্য নির্মাণকাজের জন্য স্থাপনা সরিয়ে জায়গা করে দিতে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে জাপানে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণে এ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। অন্যথায় এসব স্থাপনা ভেঙে ফেলা বা ধ্বংস করা ছাড়া উপায় থাকত না।

.

হিরোসাকি শহরের পার্ক ও সবুজায়ন বিভাগের প্রধান কেনসুকে হায়াসাকা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘১ হাজার ৮০০ স্বেচ্ছাসেবীর জন্য আমরা প্রায় ৮ হাজার আবেদন পেয়েছি। অর্থাৎ নির্ধারিত সংখ্যার প্রায় চার গুণ আবেদন পড়েছে। ফলে সবাই এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি।’

কেনসুকে জানান, শুধু হিরোসাকি শহর থেকেই নয়, বরং পুরো জাপান থেকে মানুষ এ কাজে অংশ নিতে আবেদন করেছেন। এমনকি বিদেশ থেকেও আবেদন জমা পড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবেদন পড়ে বলে জানান তিনি।

এ মাসেই আরও প্রায় ৪ হাজার ১০০ মানুষ দড়ি বেঁধে হাত দিয়ে টেনে দুর্গের মূল স্থাপনাটি মোট ৫ মিটার সরাতে সহায়তা করবেন বলে আশা প্রকাশ করেন এই কর্মকর্তা। বাকি ৭৩ মিটার সরানোর কাজ যন্ত্রপাতির সাহায্যে সম্পন্ন করা হবে।

.

কিয়োদো নিউজকে মেই উমেতসু নামের একজন বলেন, ‘১১ বছর আগে মেরামতের জন্য দুর্গটি মূল জায়গা থেকে সরানোর সময়ও আমি দড়ি টেনেছিলাম। আবারও এতে অংশ নিতে পারায় আমি আবেগাপ্লুত।’

জাপানে বর্তমানে মাত্র ১২টি দুর্গের মূল স্থাপনা টিকে আছে। জাপান ন্যাশনাল ট্যুরিজম অর্গানাইজেশনের তথ্য, ১৮৬৮ সালে সামুরাই শাসনের অবসানের পর অধিকাংশ জাপানি দুর্গ ভেঙে ফেলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও অনেক দুর্গ ধ্বংস হয়। ফলে বর্তমানে দেখা যায় এমন অনেক দুর্গই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

.

হিরোসাকি দুর্গের মূল স্থাপনাটি প্রথমে পাঁচতলা একটি টাওয়ার ছিল। ১৬২৭ সালে বজ্রপাতের আঘাতে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরে ১৮১১ সালে বর্তমান তিনতলা স্থাপনা পুনর্নির্মাণ করা হয়।

জাপানের তোহোকু অঞ্চলে হিরোসাকি দুর্গের মতো আর কোনো দুর্গ নেই। এ ছাড়া এটিই একমাত্র দুর্গ, যা এদো যুগে (১৬০৩–১৮৬৭) নির্মিত হয়েছিল এবং এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

২০০৬ সালে জাপান ক্যাসল ফাউন্ডেশন এ দুর্গকে জাপানের ১০০টি সেরা দুর্গের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।