মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা এক গভীর ও সঞ্জীবনী অনুভূতি। মানুষ যাকে ভালোবাসে, তার স্বভাব ও গুণাবলি নিজের জীবনে ধারণ করতে চায়, তার আদর্শকে জীবনের পাথেয় বানায়।

একজন মুমিনের জীবনে সবচেয়ে পবিত্র ও মহিমান্বিত ভালোবাসা হলো মহান আল্লাহর প্রেরিত রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা। রাসুলের প্রতি ভালোবাসা নিছক মৌখিক ভাবাবেগের বিষয় নয়; বরং তাঁর সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুবর্তন, জীবনাচরণের প্রতিফলন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে নিজেকে সঁপে দেওয়াই হলো প্রকৃত ভালোবাসার প্রমাণ।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ–তাআলা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)

একজন মুসলিমের সামগ্রিক জীবনে রাসুলের চরিত্রই একমাত্র অনুকরণীয় মাপকাঠি।

ভালোবাসার স্বরূপ ও শর্ত

নবীপ্রেমের দাবি মুখে প্রকাশ করা সহজ, কিন্তু এর সত্যতা প্রমাণিত হয় কর্মে ও চরিত্রে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমগ্র মানবজাতির চেয়ে অধিক প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫)

এই ভালোবাসা হতে হবে নিজের প্রাণের চেয়েও গভীর। একবার সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার নিজের প্রাণ ছাড়া আপনি আমার কাছে সবকিছুর চেয়ে প্রিয়।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘না ওমর, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে তোমার নিজের জীবনের চেয়েও প্রিয়তর হব, ততক্ষণ তুমি পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না।’

তখন ওমর (রা.) বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, এখন আপনি আমার কাছে আমার জীবনের চেয়েও প্রিয়।’ নবীজি বললেন, ‘এখন ওমর, তোমার ইমান পূর্ণ হলো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৬৩২)

.
তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।
সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১
.আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার ৩ আলামত.

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথও রাসুলের নিঃশর্ত অনুকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আল্লাহ বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৩১)

‘তুমি যাকে ভালোবাসো, তারই সঙ্গে থাকবে’

রাসুলের ভালোবাসার সুসংবাদ নিয়ে এক হৃদয়গ্রাহী হাদিস বর্ণনা করেছেন সাহাবি আনাস ইবনে মালিক। এক ব্যক্তি জানতে চাইলেন, ‘কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে?’ নবীজি প্রতি–উত্তরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেয়ামতের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছ?’

লোকটি বিনীত হয়ে বলল, ‘আমি অধিক নামাজ, রোজা বা সদকা দিয়ে কোনো বড় প্রস্তুতি নিতে পারিনি; তবে আমি অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে গভীরভাবে ভালোবাসি।’ তখন রাসুল (সা.) তাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তুমি (কেয়ামতের দিন) তারই সঙ্গী হবে, যাকে তুমি ভালোবাসো।’

আনাস (রা.) বলেন, ‘ইসলাম গ্রহণের পর এ কথার চেয়ে এত অধিক আনন্দ আমরা সাহাবিরা আর কোনো কথায় পাইনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬১৭)

তবে এ হাদিসের মর্মার্থ কখনোই ফরজ ও ওয়াজিব আমল পরিত্যাগ করা নয়; বরং অন্তরের সত্য ভালোবাসা মুমিনকে স্বাভাবিকভাবেই নবীজির সুন্নাহ অনুসরণে ব্যাকুল করে তোলে।

.উম্মতকে মহানবী (সা.) কতটা ভালোবাসতেন.
নবীপ্রেমের প্রথম দাবি হলো ব্যক্তিগত জীবনে সুন্নতের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব পরিহার করে নবীজির জীবনাদর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
.

নবীপ্রেমের ব্যবহারিক দাবি

নবীপ্রেমের প্রথম দাবি হলো ব্যক্তিগত জীবনে সুন্নতের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটানো এবং প্রবৃত্তির দাসত্ব পরিহার করে নবীজির জীবনাদর্শকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দ্বিতীয়ত, পরিবার ও সমাজে সুন্নতের প্রচার ও প্রসারে নিরবচ্ছিন্ন মেহনত চালিয়ে যাওয়া।

রাসুল (সা.) ছিলেন সততা, বিনয়, দয়া ও ক্ষমার মূর্ত প্রতীক। তিনি এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রেখেছেন, দরিদ্র ও মজলুমের পাশে দাঁড়িয়েছেন, প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং চরম শত্রুকেও হাসিমুখে ক্ষমা করেছেন।

তাঁর জীবনের অনুপম শিক্ষা হলো ক্ষমতা মানুষকে অহংকারী না করে বিনয়ী বানাবে, সম্পদ মানুষকে কৃপণ না করে দানশীল করবে এবং জ্ঞান মানুষকে উদ্ধত না করে আল্লাহভীরু করবে।

ভালোবাসা হোক পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা

নবীপ্রেম যদি হৃদয়ের অন্তস্তলে সত্যি প্রোথিত থাকে, তবে তা মানুষের চিন্তা, ভাষা ও কর্মে প্রস্ফুটিত হবে। মিথ্যা পরিহার, সততা রক্ষা, মা-বাবার প্রতি সেবা, ছোটদের স্নেহ ও বড়দের সম্মান প্রদর্শন এবং সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোই হলো রাসুলপ্রেমের জীবন্ত প্রকাশ।

পার্থিব সব মোহ ও জাগতিক সম্পর্ক নশ্বর; কিন্তু আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ভালোবাসা পরকালে নাজাতের চিরন্তন চাবিকাঠি। মুখে ভালোবাসার ফুলঝুড়ি না ছড়িয়ে আসুন আমরা রাসুলের পবিত্র সিরাত পাঠ করি, তাঁর সুন্নাহকে বুকে ধারণ করি এবং আমাদের প্রতিদিনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে তাঁর আলোয় আলোকিত করে তুলি।

  • সাকী মাহবুব: সহকারী শিক্ষক, নাদির হোসেন উচ্চবালিকা বিদ্যালয়, রাজবাড়ী

.মহানবীর (সা.) প্রতি সাহাবিদের সীমাহীন ভালোবাসা