দেশের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় থাকা ১১৭টি আইটেমের মধ্যে ৬০ শতাংশের উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। দাম সমন্বয়ে জটিলতার কারণে বেসরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব ওষুধ তৈরিতে অনীহা দেখাচ্ছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প মালিক সমিতির (বাপি) কার্যালয়ে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এই তথ্য জানানো হয়।

সভায় বাপি নেতারা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্ব সরকারি মালিকানাধীন এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডকে (ইডিসিএল) দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বাপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৯৯৪ সালে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় ১১৭টি ওষুধ থাকলেও, এর মধ্যে ১৯টি ওষুধ তৈরিতে কোনো কোম্পানি নিবন্ধন নেয়নি। বর্তমানে মোট অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মাত্র ৪০ শতাংশ উৎপাদিত হচ্ছে, বাকি ৬০ শতাংশের উৎপাদন বন্ধ। ওষুধশিল্পের মালিকদের মতে, এর প্রধান কারণ হলো দাম সমন্বয় না হওয়া।

তাঁরা উল্লেখ করেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা তৈরির পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র দুবার দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পক্ষে অনেক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই এসব ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহে ইডিসিএলকে আরও বড় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।

বাপির সাবেক মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসাইন বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এমন ওষুধ, যা সব সময় বাজারে ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত পরিমাণে মজুত ও সহজলভ্য থাকা প্রয়োজন। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।” তিনি আরও বলেন, “সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য যে ওষুধ সরবরাহ করা হয়, তার বড় অংশই ইডিসিএল থেকে সংগ্রহ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামও ‘এসেনসিয়াল ড্রাগস’। তাই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্বও তাদের ওপর দেওয়া যেতে পারে। ইডিসিএল বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা পায়। সারা দেশে তাদের পাঁচটি উৎপাদন কারখানা রয়েছে। ফলে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতাও তাদের বেশি। সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের দায়িত্ব ইডিসিএলকে দেওয়া হোক।”

বাপির বর্তমান মহাসচিব ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ হালিমুজ্জামান বলেন, “সময়ের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। আমরা তালিকা তৈরির বিপক্ষে নই। তবে আমাদের দাবি, সব খাতের অভিজ্ঞ ও অংশীজনদের নিয়ে এটি তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে এসব ওষুধের মান নিশ্চিত করে জনগণের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “বেসরকারি কোম্পানিগুলোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদন করে বাজারে টিকে থাকা কষ্টসাধ্য। ১৯৯৪ সালে প্রণীত ১১৭টি অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকার মধ্যে বর্তমানে খুব অল্পসংখ্যক ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। অনেক ওষুধ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। তাই সম্ভব হলে এসব ওষুধ ইডিসিএলের মাধ্যমে উৎপাদন করে জনগণের কাছে সুলভ মূল্যে, এমনকি বিনা মূল্যে বিতরণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।”

সভায় বাপির সিনিয়র সহসভাপতি ও ইউনিমেড ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান মো. মোসাদ্দেক হোসেন বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “বিশ্বের খুব কম দেশই ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে এবং বাংলাদেশ সেই দেশগুলোর একটি। ওষুধ রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করছে। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে আমাদের সরাসরি প্রতিযোগিতা রয়েছে। দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিদেশি কোম্পানিগুলো সেই জায়গা দখল করে নিতে পারে। তাই এমন কোনো নীতি গ্রহণ করা উচিত হবে না, যাতে দেশের ওষুধশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ে।”

মতবিনিময় সভায় বাপির নেতারা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশ ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণের আহ্বান জানান। এ সময় বিএইচআরএফের জেনারেল সেক্রেটারি মুজাহিদ শুভ বলেন, “সংকট মোকাবিলায় ওষুধ খাতের প্রতিটি অংশীজনের সঙ্গে বসতে চাই আমরা। সংকট চিহ্নিত হলে সমাধানও বের হবে।”