ঝালকাঠি জেলার ৫৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৫টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলো শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও পাঠদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠিতে মোট ১৯৫ জন প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। ১২৫টি বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে তাদের নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে। শুধু বিদ্যালয় নয়, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাতেও জনবল সংকট প্রকট। জেলার চার উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ২৬টি পদের মধ্যে ১২টি এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরে ১১টি পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং প্রশাসনিক তদারকি—প্রাথমিক শিক্ষার এই তিন গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

উপজেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ১৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টিতে, নলছিটি উপজেলায় ১৬৭টির মধ্যে ৫৭টিতে, রাজাপুরে ১২৪টির মধ্যে ৪২টিতে এবং কাঁঠালিয়ায় ১৩২টির মধ্যে ৪৫টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ, চার উপজেলার ৫৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৫টিতেই প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রশাসনিক নেতৃত্ব এখন ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকদের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে নলছিটি উপজেলায় প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ সবচেয়ে বেশি।

ঝালকাঠি জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মোট ৫৭ হাজার ২৮০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যার মধ্যে ২৬ হাজার ৮৫৪ জন ছেলে এবং ৩০ হাজার ৫২৬ জন মেয়ে। প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষকের সংকটের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষকেরও সংকট রয়েছে। জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৩০০৩টি হলেও কর্মরত আছেন ২ হাজার ৭১৬ জন। ১২৫ জন চলতি দায়িত্বে থাকায় ২৮৭টি পদ শূন্য রয়েছে। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে ঝালকাঠি সদরে ৩২টি, নলছিটিতে ৬৬টি, রাজাপুরে ১১৭টি এবং কাঁঠালিয়ায় ৭২টি পদ খালি। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর কাজের চাপ বাড়ছে এবং শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, নিয়মিত পাঠদান ও পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে একই সঙ্গে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য, সেখানে পরিস্থিতি আরও জটিল।

সহকারী শিক্ষকরা জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি এবং সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ নানা কাজে জটিলতা তৈরি হয়। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় অনেক সময় মূল পাঠদানে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার ৯১নং দেরকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান বলেন, “প্রধান শিক্ষক না থাকায় আমি দুই বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। একই সঙ্গে ক্লাস এবং প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাতে হয়। স্কুলে আমিসহ মাত্র ৪ জন শিক্ষক রয়েছি। সব কিছু সামলাতে খুবই কষ্ট হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিলে স্কুলের জন্য ভালো হতো।”

কাঁঠালিয়া উপজেলার ৪৪নং কাঁঠালিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান বলেন, “দেড় বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। অথচ সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। আমাদের প্রধান শিক্ষক করার কথা থাকলেও আজও করা হয়নি। এর চেয়ে বড় দুঃখের আর কিছুই নেই। বিদ্যালয়ে ৩০১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। সব মিলিয়ে চালাতে হিমশিম খেতে হয়।”

সচেতন মহলের মতে, তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বড় অংশ অনুপস্থিত থাকলে বিদ্যালয় পরিদর্শনের কার্যকারিতা ও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) ঝালকাঠি জেলার সাধারণ সম্পাদক ও টিআইবির সনাক সদস্য ইসমাঈল মুসাফির বলেন, “জেলার প্রাথমিক স্তরের এতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যদি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক পদ শূন্য থাকে তাহলে অবশ্যই স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয় বরং দক্ষ ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত না করলে মানসম্মত শিক্ষা অর্জন সম্ভব নয়। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাপনা কমিটিতে দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব দূর করতে হবে। সরকারকেও শিক্ষা খাতে জিডিপির তুলনায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।”

ঝালকাঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহিনুল ইসলাম মজুমদার বলেন, “প্রধান শিক্ষকের সংকটের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সরকারের ওপর নির্ভরশীল। নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে এই সমস্যা সমাধান হবে।”

প্রাথমিক শিক্ষার মতো শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি স্তরে দীর্ঘদিন ধরে এতসংখ্যক প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের কার্যকর নেতৃত্ব ও পর্যাপ্ত শিক্ষক নিশ্চিত করা মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত। ঝালকাঠির ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ এবং সহকারী শিক্ষকের ২৮৭টি শূন্য পদ দ্রুত পূরণ করা না হলে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও শিক্ষার গুণগত মান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থার শূন্য পদগুলো পূরণ করে প্রশাসনিক কাঠামোকে কার্যকর করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।