যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভার সিনেটর আয়শা ওয়াহাব মার্কিন কংগ্রেসের সাবেক সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের শূন্য আসনে অনুষ্ঠিত বিশেষ নির্বাচনে জিতেছেন। নির্বাচনে আয়শার প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে ইসরায়েলপন্থী বিভিন্ন গোষ্ঠী—তবু তারা আয়শার জয় ঠেকাতে পারেনি।

গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যম আয়শার জয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল। তিনি ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী মেলিসা হার্নান্দেজকে হারিয়েছেন। এরপর আয়শা মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি হচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকা সান ফ্রান্সিসকো বে এলাকার দক্ষিণ-পূর্ব অংশ নিয়ে গঠিত। সাবেক কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েলের মেয়াদের বাকি সময় আয়শা সেখানে দায়িত্ব পালন করবেন; তাঁর মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।

বিজয়ের পর দেওয়া বিবৃতিতে আয়শা বলেন, ‘যে এলাকা আমাকে বড় করেছে, আমি সেই এলাকার মানুষের অধিকারের জন্য লড়ে যাব।’ বিপুল অর্থ ঢেলে করা নেতিবাচক প্রচারণার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তাঁর এ বিজয় প্রমাণ করেছে যে এই আসনের ভোটারদের অর্থ দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।

নিজের জীবন সংগ্রামের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আয়শা বলেন, ফস্টার কেয়ার (অনাথ বা দত্তক নেওয়া শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র) থেকে শুরু করে মার্কিন কংগ্রেস পর্যন্ত পৌঁছানোর এ দীর্ঘ যাত্রা প্রমাণ করে যে সব স্বপ্নই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে কাজ করে আসছেন আয়শা। প্রথম আফগান বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য হতে যাচ্ছেন তিনি।

সাবেক কংগ্রেস সদস্য এরিক সোয়ালওয়েল গত এপ্রিলে পদত্যাগ করায় এ বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরিকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর তিনি পদত্যাগ করেন। তবে ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

বিজয়ের এই নির্বাচনকে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলপন্থী লবি বা গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবের বিস্তার নিয়ে আরেকটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজা ও ইরান যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত জুলাইয়ে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েল জাতিগত হত্যা চালিয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও এমন অভিযোগ করেছে।

আয়শার নির্বাচনী প্রচারে পররাষ্ট্রনীতি প্রধান বিষয় ছিল না। তবে গাজা যুদ্ধ নিয়ে তাঁর অবস্থান আগে থেকেই স্পষ্ট ছিল। গত বছর ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের কথা তুলে ধরে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাসের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার আয়শা ওয়াহাব। চলতি বছরের এপ্রিলে এক নির্বাচনী বিতর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর যা ঘটছে, সেটিকে তিনি ‘জাতিগত হত্যা’ মনে করেন কি না। ওয়াহাব সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বলে উত্তর দেন।

অন্যদিকে হার্নান্দেজ এ প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি। তিনি বলেন, ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার আছে। তবে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ সীমা ছাড়িয়ে গেছে।

বিশেষ নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপে ওয়াহাব বড় ব্যবধানে জয় পান। জুনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে তিনি ৪২ শতাংশের বেশি ভোট পান, অন্যদিকে হার্নান্দেজ পান ১৭ শতাংশ ভোট। এরপর নির্বাচনের মূলপর্ব যত এগিয়েছে, দুই প্রার্থীর ব্যবধানও কমেছে। আগস্টের শুরু থেকে হার্নান্দেজকে সমর্থন দিতে ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট নামে একটি রাজনৈতিক তহবিল প্রায় ২৫ লাখ ডলার খরচ করেছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

সংগঠনটি ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী গোষ্ঠী আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (আইপ্যাক) সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়া আইপ্যাকের অর্থায়ন পাওয়া আরেকটি সংগঠন বোল্ড আমেরিকাও প্রায় ১৯ লাখ ডলার খরচ করেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।

ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন চেষ্টা বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছে।

আগামী নভেম্বরে ওয়াহাব ও হার্নান্দেজের আবার মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। ওই নির্বাচনে জয়ী প্রার্থী ক্যালিফোর্নিয়ার ১৪তম কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের পূর্ণ দুই বছরের মেয়াদের প্রতিনিধি হবেন।

ওয়াহাবের জয়ের পর ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগতিশীল কংগ্রেসসদস্য রো খান্না তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি এবং ইরান যুদ্ধ বন্ধের মতো বিষয়ে আয়শার সঙ্গে তিনি কাজ করতে আগ্রহী।