একসময় নীলফামারীর গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল পাট। ‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পরিচিত এই ফসলটি ছিল স্থানীয় কৃষকদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী উৎস। বর্ষাকালে পাট কাটা, জাগ দেওয়া এবং আঁশ ছাড়ানোর প্রক্রিয়ায় গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হতো। তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং জাগ দেওয়ার পানির অভাবসহ নানা অনিশ্চয়তার কারণে এখন পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেক কৃষক।
অন্যদিকে, কম সময়ে ফসল ঘরে তোলা, পরিচর্যার ঝামেলা কম এবং বাজারে উচ্চ চাহিদার কারণে কৃষকদের কাছে ভুট্টার আকর্ষণ বাড়ছে। ফলে নীলফামারীর বিভিন্ন এলাকায় পাটের জমিতে এখন জায়গা করে নিচ্ছে ভুট্টা। উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে লাভ ও ঝুঁকির এই নতুন হিসাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে ফসলের এই পরিবর্তন।
জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে আগের মতো পাট চাষ আর চোখে পড়ে না। অনেক জমিতে ভুট্টার পর এখন ধান আবাদ করা হয়েছে। কৃষকদের মতে, ফসল নির্বাচন এখন আর অভ্যাসের ওপর নয়, বরং উৎপাদন খরচ, সময়, শ্রম, বাজারদর ও বিক্রির নিশ্চয়তার হিসাবের ওপর নির্ভর করছে।
এই বিষয়ে কৃষক জলিল মিয়া বলেন, "পাট চাষ এখন আর আগের মতো করা হয় না। এর প্রধান কারণ জাগ দেওয়া। পাট কাটার পর আঁশ পচানোর জন্য দীর্ঘ সময় পানিতে জাগ দিতে হয়। কিন্তু অনেক এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীর ও পরিষ্কার পানি পাওয়া যায় না। ফলে পাট চাষিকে দূরের জলাশয়ে যেতে হয়, নয়তো কৃত্রিম ব্যবস্থা করতে হয়।"
আরেক কৃষক অরবিন্দু রায় জানান, "পাট চাষ করলে এখন ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। বৈরী আবহাওয়ার কারণে পাট বোনার পর হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে জমিতে পানি জমে গেলে চারা আর বাড়ে না। এছাড়া পাট কাটা, আঁটি বাঁধা, বহন, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোর প্রতি ধাপে প্রচুর শ্রমিক লাগে। শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এই খরচ অনেক বেড়ে গেছে।"
কৃষকদের দাবি, পাটের বাজারদর ভালো থাকলেও অতিরিক্ত শ্রমিক খরচ, প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রত্যাশিত ফলন না পাওয়ার কারণে লোকসানের ঝুঁকি থাকে। তাই ঝুঁকি এড়াতে তাঁরা ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন। তাঁদের মতে, ভুট্টার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি স্বল্প সময়ে ঘরে তোলা যায় এবং পাটের মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের ঝামেলা নেই। পশুখাদ্য ও পোলট্রি ফিডের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাজারে বিক্রির নিশ্চয়তা থাকে এবং একই জমিতে পরবর্তী ফসল আবাদের সুযোগ পাওয়া যায়।
ডোমার উপজেলার কৃষক জামিয়ার রহমান বলেন, "পাট চাষ মানেই আতঙ্ক—নিড়ানি, সার, আর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ কাটা ও জাগ দেওয়া নিয়ে। কিন্তু ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে নিড়ানি ও সার নিজেই দেওয়া যায়। ফসল তোলার পর তা ভাঙার জন্য এখন মেশিন পাওয়া যায়। তাই পাটের মতো দুশ্চিন্তা থাকে না।"
কৃষক লোকমান হোসেন বলেন, "কৃষক এখন লাভের হিসাব করে চাষ করেন। যে ফসলে সময় কম লাগে, খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং বিক্রি করে দ্রুত টাকা পাওয়া যায়, স্বাভাবিকভাবেই সেদিকেই আগ্রহ বেশি।"
তবে অভিজ্ঞ কৃষকদের মতে, বাজারদর ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পাট এখনো লাভজনক হতে পারে। কিন্তু বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিশ্চয়তার কারণে অনেকে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে ডোমারে ৯৫০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে এবং এবার পাটের দামও মোটামুটি ভালো। তবে তিনি বলেন, "গত ২-৩ বছর ধরে দেশে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পাশাপাশি হঠাৎ বৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণেও কৃষকদের আগ্রহ কিছুটা কমছে।"
নীলফামারীর কৃষকের অর্থনৈতিক আশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পাটের জমিতে এখন ভুট্টার শিষ দুলছে। মাঠের এই রূপান্তর কেবল ফসলের পরিবর্তন নয়, বরং কৃষকের বদলে যাওয়া অর্থনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কৃষকের ঝুঁকি কমানো গেলে তবেই পাটের প্রতি আগ্রহ পুনরায় ফিরে আসতে পারে।