মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ২০২১ সালের ৮ মে সন্ধ্যায় কবি খেৎ থি ও তাঁর স্ত্রী সও সু-কে মনিওয়া প্রদেশের সাগাইং অঞ্চলের শোয়েবো শহরে অবস্থিত কবির বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দম্পতিকে আগে স্থানীয় একটি থানায় আটক রাখা হয়। পরে কবি খেৎ থিকে তাঁর স্ত্রী থেকে আলাদা করে কাছের এক সামরিক ছাউনিতে নেওয়া হয়। ওই রাতেই তাঁকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।

পরদিন ৯ মে সকালে কবির স্ত্রীকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার পর বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর স্বামী আহত হওয়ায় তাঁকে মনিওয়া হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তিনি যেন সেখানে যান। তবে হাসপাতালে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামীকে মৃত অবস্থাতেই হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরে মর্গে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তাঁর স্বামীর ক্ষতবিক্ষত লাশ সেখানে পড়ে আছে এবং সেখানকার ক্ষত থেকে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন অঙ্গ কেটে খুলে নেওয়া হয়েছে।

কবি খেৎ থিকে বাড়িতে বিস্ফোরক সামগ্রী মজুত করার সন্দেহে আটক করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এর পক্ষে কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ জান্তা খুঁজে পায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। বহু নির্যাতনের পরও তাঁর কাছ থেকে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেনি জান্তা। আমৃত্যু মুখ খোলেননি বলে খ্যাতি পাওয়া এই কবি।

খেৎ থির জন্ম ১৯৭৬ সালে এবং তাঁর আসল নাম জও তুন। সাগাইং অঞ্চলে ২০২১-এর মার্চে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মাত্র দুই মাসের মধ্যে মোট তিনজন কবিকে জান্তা বাহিনী হত্যা করে। ৪৫ বছর বয়সী খেৎ থি ছাড়াও শহীদের তালিকায় ছিলেন ৩৯ বছর বয়সী কে জা উইন ও ৩৬ বছর বয়সী কিই লিন্ আয়ে।

মিয়ানমারের জাতীয় ঐক্য সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামরিক শাসনবিরোধী প্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে কবি খেৎ থিকে হত্যা করা হলেও তাঁর ভাবধারা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বলা হয়। বলা হয়, জান্তা একজন জীবন্ত কবিকে নিয়ে গেলেও ফিরিয়ে দিয়েছে তাঁর মৃতদেহ।

কবি খেৎ থি লিখেছেন:

ওরা মাথায় গুলি করে,

কিন্তু ওরা জানে না

বিপ্লব থাকে হৃদয়ে।

২০২১-এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর তিনি আরও লিখেছিলেন:

আমি যদি আর এক মিনিটও বাঁচি

আমি চাই, আমার বিবেক যেন পরিষ্কার থাকে।

এ বিষয়ে বলা হয়, আমৃত্যু তিনি নিজের বিবেক পরিষ্কার রেখে গেছেন এবং কোনো মূল্যের বিনিময়েই তাঁকে জনবিরুদ্ধতার কালিমালিপ্ত হতে দেননি।

২০২১-এর ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পরবর্তী মাস দুয়েকের মধ্যে উল্লিখিত তিন কবিসহ অন্তত ৭৬১ জন নিরস্ত্র বেমামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। খেৎ থি পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। ২০০৪ থেকে ২০১২ পর্যন্ত তিনি কালায়, শোয়েবো ও মনিওয়া পৌরসভায় জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর চাকরি ছেড়ে দেন সার্বক্ষণিকভাবে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ততা ও লেখালেখির তাগিদে। পরিবারে জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি খণ্ডকালীনভাবে নিজেদের তৈরি কেক ও আইসক্রিম বিক্রি করে আসছিলেন। শহীদ হওয়ার মাত্র দুই বছর আগে তিনি বিয়ে করেছিলেন।

সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে সাগাইংয়ের পালেতে সামরিক একনায়কতন্ত্রবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে খেৎ থি ছিলেন একজন সম্মুখসারীর অংশীদার বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর শাহাদাতবরণের সময় তাঁর নিজের ভাই মোনিওয়া কারাগারে বন্দী ছিলেন—সামরিক জান্তাবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে। তাঁর মৃত্যুসংবাদ তাঁর বৃদ্ধ মায়ের কাছে গোপন রাখা হয় বলে প্রতিবেদনে এসেছে।

মিয়ানমারে সামরিক শাসনের প্রতিপক্ষ হিসেবে গঠিত জাতীয় ঐক্য সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কবি উ য়ী মন্ তাঁর ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘খেৎ থিসহ মোনিওয়ার তিনজন কবি শহীদ হয়েছেন। আমি শোকার্ত। জয় না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে আমি অঙ্গীকারবদ্ধ।’

খেৎ থির মৃত্যুকে মিয়ানমারের আরেক বিপ্লবী কবি ইয়ো খাৎ কবিতার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে দেখেছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিরোধ করছেন, তাঁদের কাছে তিনি চিরসম্মানিত হয়ে থাকবেন। ইয়ো খাৎ বলেন, ‘আদিকাল থেকে কবিরা তাঁদের হৃদয় ও মস্তিষ্ক দিয়ে অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন। খেৎ থি ঠিক এটাই করে আসছিলেন বিপ্লবের শুরু থেকেই। তিনি জ্ঞান বিতরণ করে মানুষকে বিপ্লবে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর মৃত্যু কবিতার জগতের জন্য এক বিশাল ক্ষতি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, খেৎ থির জীবন ও কর্ম আর কবিতার মধ্যে কোনো ফারাক ছিল না। তিনি যা করতেন এবং ভাবতেন, তা সরাসরি তাঁর কবিতায় প্রকাশ করতেন বলে উল্লেখ করা হয়।

খেৎ থি শহীদ হওয়ার পর মোনিওয়ার আরেক কবি ও আন্দোলনকর্মী নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘(খেৎ থি) যখন কবিতা লিখতেন, সেগুলো নিছক সাহিত্য ছিল না, ছিল তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারার প্রকাশ। আর তাঁর চিন্তাধারা ছিল রাজনীতি প্রণোদিত। তাঁর কবিতা আর অন্যদের কবিতার মধ্যে পার্থক্য ছিল এই যে তাঁর কবিতা সূক্ষ্ম অলংকারমণ্ডিত ছিল না—ছিল সরল আর স্বচ্ছ।’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নিচে বাংলায় অনূদিত মিয়ানমারের খেৎ থির দুটো কবিতা উপরিউক্ত অনামধেয় কবির কথার সত্যতা নিশ্চিত করবে নিশ্চয়:

টিকে থাকার স্মারকলিপি

আমি কোনো বীর নায়ক হতে চাই না

কোনো শহীদ হতে চাই না কাপুরুষও হতে চাই না।

আমি কোনো দুঃসাহস দেখাতে চাই না

কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে চাই না

লজ্জিত হতে চাই না।

আমি বাঁধা জিবে উচ্চারিত ভাষণ শুনেছি

আমি বসবাস করেছি বন্দী মানবাধিকারের সঙ্গে নির্বীর্যকরণের দিনগুলো আমি পেরিয়ে এসেছি

আমরা চাই নিজেরাই নিজেদের নরকের অবসান ঘটাতে।

আমি সুবিধাবাদী রাজনীতিক হতে চাই না

স্বপ্নচারী কবিও হতে চাই না

চাই না অবিচার মেনে নেওয়াদের একজন হতে।

এমনকি আর একটা মিনিটও যদি আমি বেঁচে থাকি

আমি চাই আমার বিবেক যেন পরিষ্কার থাকে।

আমি গুলি ছুড়ব

আমি বন্দুক চালাতে পারি না

আমি বন্দুক চালাতে পারি না

আমার হাত গিটার বাজায় আমি বন্দুক চালাতে পারি না

আমার হাত শুধু কবিতা লেখে আমি বন্দুক চালাতে পারি না

আমি শুধু সাজাই জন্মদিনের কেক

কিন্তু এখন যেখানে আমার মানুষদের গুলি করা হচ্ছে

শুধু কবিতা দিয়ে কি আমি পাল্টা গুলি চালাতে পারি

আমার মনে হয় সেটা উচিত হবে না অপরাধবোধে ভরা মনে ভাবি

গুলি চালাব

আমি গুলি চালাব

যখন নিশ্চিত হব

শুধু শব্দ দিয়ে আর কিছু বলা যাবে না

তখন সাবধানে বন্দুক বেছে নেব

আমি গুলি ছুড়ব।