সীতাকুণ্ডের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে সম্প্রতি ৯ জন শ্রমিকের প্রাণহানি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, কেবল আইন প্রণয়ন বা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়; বরং কর্মক্ষেত্রে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে এক দিনে ৯ জন শ্রমিকের মৃত্যুর এই ঘটনা গত ২৫ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই দুর্ঘটনার কারণ এবং সেখানে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না, তা বর্তমানে তদন্তাধীন। তবে এই ঘটনা কেবল একটি কারখানার ত্রুটি নয়, বরং পুরো শিল্পের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—আন্তর্জাতিক মানদণ্ড গ্রহণের পর আমরা কি সত্যিই শ্রমিকের নিরাপত্তাকে শিল্প পরিচালনার কেন্দ্রে আনতে পেরেছি?
প্রশ্নটি এখন আরও প্রাসঙ্গিক, কারণ ২৬ জুন ২০২৫ তারিখে হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সাউন্ড রিসাইক্লিং অব শিপস (এইচকেসি) কার্যকর হয়েছে। এর ফলে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এখন আর কোনো লক্ষ্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক কাঠামোর বাস্তব অংশ। বিশ্বের অন্যতম প্রধান জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব এখন আরও বেশি।
সীতাকুণ্ডের প্রায় ২০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা এই শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পুরোনো জাহাজ থেকে প্রাপ্ত লোহা দেশের ইস্পাত ও রি-রোলিং শিল্পের প্রধান কাঁচামাল এবং এর মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। তবে অর্থনৈতিক অবদান কোনোভাবেই শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস, রাসায়নিক পদার্থ, তেলজাতীয় উপাদান এবং অ্যাসবেস্টসের মতো বিপজ্জনক উপাদানের উপস্থিতি থাকে। অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ কিংবা ভারী কাঠামো ভেঙে পড়ার ঝুঁকি এখানে সবসময় বিদ্যমান।
বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে এই খাতে বেশ কিছু সংস্কার করেছে। ২০২৩ সালে এইচকেসি অনুসমর্থন এবং ২৩টি কারখানার গ্রিন সার্টিফাইড বা এইচকেসি কমপ্লায়েন্ট হওয়া একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু ফেরদৌস স্টিলের এই দুর্ঘটনা প্রমাণ করে যে, সার্টিফিকেশনই নিরাপত্তার শেষ কথা নয়। এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) নিয়ম অনুযায়ী, এইচকেসি সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডকে শ্রমিক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং জরুরি প্রস্তুতিসহ নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা কাঠামো অনুসরণ করতে হয়, অন্যথায় সনদ বাতিল হতে পারে। ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডও গ্রিন সার্টিফায়েড, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—এই ব্যবস্থাগুলো কি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল?
প্রকৃত নিরাপত্তার মাপকাঠি হলো—শ্রমিক ভেতরে প্রবেশের আগে বিষাক্ত গ্যাসের পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনার দ্রুত রিপোর্ট করা, জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার। পাশাপাশি তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে আনা এবং দায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোনো ইয়ার্ড যদি মানদণ্ড পূরণ না করে, তবে অর্থনৈতিক চাপের কথা চিন্তা না করে তার সনদ বাতিল করতে হবে। সার্টিফিকেশন এজেন্সিগুলোর এখানে দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি।
পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তেল ও দূষিত পদার্থের ছড়িয়ে পড়া রোধে কেবল ইয়ার্ডের ভেতরে উন্নত ব্যবস্থাপনা যথেষ্ট নয়; জাতীয় পর্যায়ে বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও নিরাপদ নিষ্পত্তির অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং মানে কেবল সবুজ অবকাঠামো নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ ব্যবস্থাপনা।
আগামী এক দশকে প্রায় ১৬ হাজার জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বাজারে আসতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। তবে ভারত ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখন আর কম খরচে জাহাজ ভাঙার লড়াই নয়, বরং নিরাপদ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার লড়াই করতে হবে।
এই বাস্তবতায় তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন: প্রথমত, প্রতিটি ইয়ার্ডে এইচকেসি ও জাতীয় আইনের কঠোর বাস্তবায়ন; দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তাকে প্রতিদিনের কাজের সংস্কৃতিতে রূপান্তর করা; এবং তৃতীয়ত, দুর্ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত ও দায় নির্ধারণ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ। একটি হলো কেবল বৃহৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকারী দেশ হিসেবে থাকা, অন্যটি হলো নিরাপদ ও শ্রমিকবান্ধব শিল্পের আন্তর্জাতিক উদাহরণ হয়ে ওঠা।
"দ্বিতীয় পথটি কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। ভবিষ্যতের সাফল্যের মাপকাঠি হবে কতটি জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হলো তা নয়—কতটি জাহাজ নিরাপদে, পরিবেশসম্মতভাবে এবং শ্রমিকের জীবন ও মর্যাদা রক্ষা করে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হলো। এখন সময় এসেছে কমপ্লায়েন্সের প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকতে হবে শ্রমিকের জীবন।"
—মোহাম্মদ আলী শাহীন, জাহাজভাঙা-বিষয়ক গবেষক, ইপসা। (মতামত লেখকের নিজস্ব)